স্ক্রল এগজিভিশন; দৈনিক প্রদর্শনী
দেখুন, পড়ুন শব্দ রঙের আবহে যত্ন নিন
গিগা জার্নাল একটি ধারাবাহিক আর্ট এবং পোয়েট্রি প্ল্যার্টফর্ম, দৈনন্দিন হাঁপরের ছাই উড়ে আসে যেরকম, সেই আগুনের খোঁজ, কলকারখানার কালো দাঁতের ভেতর জ্বলন্ত অক্ষরসজ্জা, বুক থেকে খুঁটে তোলা আয়না, হরফগুলোর নিয়মিত সংযোজন ও সংগ্রহ...
নতুন ধারাবাহিক সংখ্যা— 'জড় রঙিন মুক্তি'
প্রথম সংখ্যা— 'পুনরায় আলোর বৃশ্চিক'
পোস্ট পিক্সেল নীরবতা
(২)
নদীতে মৃত প্রজাপতি এসে পড়ে,
আমি ভাবি প্রকৃতির কারুকাজ,
দেওয়ালের গায়ে সাদা-ফ্রেম
ভিতর ফাঁকা।
সবুজে অবুজে তখন বাষ্প,
চামড়ার গভীরে মঙ্গল তাবিজ,
ব্রত রেখেছেন হেরা,
ব্লেড দিয়ে বৃষ্টি কাটে যুবক
জন্মদিনকে উপেক্ষা করে পরে নিচ্ছে অভিশাপেরে মালা।
যুবতী চুলে তাঁর মেঘ ধরেছে,
পরনে তাঁর লোহার সাজ, ঈশ্বর ফ্যাকাশে
সৃষ্টির কাজে হাত দেওয়ার আগে খুঁজছেন উপাদান
মায়ায় পড়ে সেই যুবতীর বুকে ঢেলে দিলেন অভিমানের দোয়াত।
(৩)
যদি যথেষ্ট মাইকেল জ্যাকসন না হতে পারেন,
তবে ফর্সা হওয়ার ক্রিম মাখুন,
'কালো' মানুষের খুন নিয়ে এই সভ্যতায় কেউ ভাবে না, যে সভ্যতার রোদ নিভে গেছে সেখানে সংখ্যালঘু বেছে তাঁদের অসামাজিক মাপকাঠিতে পিষে মারতে সময় লাগে বারো মিনিট বারো সেকেন্ড।
(৪)
টিভির সামনে শহর খুঁজি,
যে সব শরীরে আঁচড় কেটেছি,
সেই শরীরে দেখি হলুদ শোক,
বাবার শরীর হাড়ে ডাকপিওন এসে উচ্ছেদ বিজ্ঞপ্তি ধরিয়ে দিয়ে যায়।
মা মাঝে মাঝে দু'লাইন গুনগুন করে ওঠে,
উনুনে তখন গতি বাড়িয়ে ভাত ফুটছে,
একদিন পৃথিবীতে সবার হাতে গাণ্ডীব,
বেড নম্বর তিনের পাশে রাখা আছে রক্তমাখা রক্ষা-কবচ।
(২)
এইসব শীতল গোধূলী—ঠান্ডা কাচের গায়ে লেগে থাকা নিঃশ্বাস—
দুপুরের চোখে আমি বসিয়েছি গলন্ত ধাতু
তাকালেই গলে যাচ্ছে সব—রাস্তা মোম, মানুষ মোমবাতি
একটা রেডিও—মৃত কণ্ঠের লাশঘর—খবর পড়ে যাচ্ছে
শুনতে পাচ্ছিনা কিছু—তবু ভয় জমে ওঠে শিরায়
নিজের গায়ে হাত রাখলে—ধোঁয়া ওঠে পোড়া রাবারের মতো
আমি আর মানুষ নই চন্দ্রিমা—
ভস্মস্তূপ—রণাঙ্গনে পড়ে থাকা ভাঙা মূর্তি
(৩)
কালো কূপের মতো অনন্ত রাত—
অন্ধকার গায়ে মাখতেমাখতে ঝিমিয়ে পড়ছি
জানালার বাইরে দাঁড়িয়ে একজোড়া চোখ—
মুখহীন—য্যানো আলোর উপর বসে থাকা পোকা
আমি তাকালেই হেসে ফেলছে—কাচ ভাঙা শব্দে
দাঁতের ফাঁক থেকে ঝরে পড়া বালু—সময়ের গুঁড়ো
দেয়াল আমার দিকে এগিয়ে এসে—
ভেজা বইয়ের পাতার মতো ফুলে উঠছে
আমি বসে আছি—চোখ বন্ধ করে—
মুক্তি আর বন্দিত্ব—দুইয়ের মাঝে ঝুলে থাকা ছিন্ন যাপন
(৪)
হেমন্তের বিকেল মেরুন হয়ে গ্যাছে—
শুকনো বাতাসে উড়তে ইচ্ছে করেছে না
ডানা পোড়া পাখির মতো
হাড়ের ভিতর বেজে যাওয়া অস্থির বাঁশি—যুদ্ধশেষে ফেলে রাখা ট্রাম্পেট
আমি হাঁটতে গ্যালেই নিচ থেকে সরে যায় মাটি—
রাস্তার গা বেয়ে ওঠে ঢেউ—সমুদ্রের অসুখে আক্রান্ত শহরে
আমি পড়ে যাই নিজের ভিতর—
জীর্ণ ঘরের মধ্যে হাতড়ে ফিরি শূন্যতা
আমি কি মাটি হারিয়ে ফেলেছি চন্দ্রিমা?
(৫)
আলো নিভিয়ে দাও—চোখগুলো অতিরিক্ত স্বচ্ছ—
নক্ষত্র দৃষ্টি—অপারেশন থিয়েটারের নির্মম লাইট
আমি লুকোতে গ্যালে দেয়াল স্বচ্ছ হয়ে যায়
মানুষেরা দেখে ফেলছে—অভ্যন্তরীণ জটিল অঙ্গপ্রত্যঙ্গ
শুনতে পাই—ফিসফিসিয়ে বলছে—ত্রুটিপূর্ণ মুদ্রণযন্ত্রের মতো আমার শরীর
আয়না দেখিনা বেশ কয়েকদিন গ্যালো
কারণ মুখ বদলায়—পোস্টারের ওপর নতুন পোস্টারের মতো
কিন্তু আমি স্থির—
শুধু পরিবর্তনই একমাত্র স্থায়ী বিকৃতি
কবিতার ডেফিনিশন
কোনো সুগার-কোটেড বড়ি নয়। কবিতা বাসের কন্ডাক্টরের ছেঁড়া টিকিটের পেছনে লেখা ফোন নম্বর, কিংবা গড়িয়াহাটের মোড়ে কুড়িয়ে পাওয়া একটা মরচে ধরা চাবির রিং। রবীন্দ্রনাথ তো সব বলে যাননি, কিছু তো আমাদেরও খুঁজতে হবে ধর্মতলার ধুলোয়। কবিতা মানে শুধুই 'তোমাকে ভালোবাসি' আর 'হায়, বিড়ালটা মরে গেল' মার্কা কান্না নয়, কবিতা হলো মানুষের সেই খসখসে গলার আওয়াজ, যা ভিড়ের মধ্যেও আলাদা করে চেনা যায়। আমরা অপরের গল্প শুনতে সত্যিই আর আগ্রহী নই? নাকি স্ক্রোল করতে করতে আমাদের আঙুলগুলোই শুধু বেঁচে আছে?
ডেফিনিশন: আয়না, যা ভাঙলে প্রতিটা টুকরোয় নিজের আসল কদর্য আর সুন্দর মুখটা একসাথে দেখা যায়।
মহাজাগতিক বিষাদ
সূর্যটা আজ খুব বেশি ব্যক্তিগত। কলকাতা ৩৯ ডিগ্রি। বাইপাসের ট্রাফিকে জ্যাম, আর আমার মাথায় ব্ল্যাকহোল; যেন কৃত্তিকা নক্ষত্রকে গিলতে যায় কোনো ধূমকেতু, কিংবা তীব্র এক্স-রে রশ্মিতে পুড়ে যায় একাকী উপগ্রহের পিঠ। রেডিওতে সস্তা পপ বাজছে, অথচ চারপাশ কী ভীষণ স্তব্ধ! মহাবিশ্বের সব আলো শুষে নেওয়া ডার্ক ম্যাটার আজকাল মানুষের বুকের বাম দিকে এসে বাসা বাঁধে। তুমি চলে যাওয়ার পর গ্যালাক্সিগুলো আরও দূরে সরে যাচ্ছে, নীল অপসরণ, বিগ ব্যাং-এর শেষ। কিস্যু বাকি নেই।
এই কসমিক ট্র্যাজেডির মাঝেও, ফুটপাথের ওপারে—কেউ একজন প্লাস্টিকের চামচে আইসক্রিম গলিয়ে সুখ খুঁজছে। কী আইরনি, না? ব্রহ্মাণ্ড ভাঙছে, আর আমাদের চিন্তা শুধু গলে যাওয়া বরফ নিয়ে।
রাত তিনটের নৈশব্দ্য
রাত তিনটেয় ইনসোমনিয়া এসে দরজায় কড়া নাড়ে, মনটা তখন অফলাইন। গোটা পৃথিবী চাদর মুড়ি দিয়ে গভীর ঘুমে কাদা যখন, তুমি কেন কাঁধে ব্রহ্মাণ্ডের দায়িত্ব তুলে নিতে চাও? হাত তোলার ভিড়ে নিজের হাতটা নামিয়ে রাখাই তো আসল ম্যাজিক।
বারান্দায়। রাস্তার কালু কুকুরটা অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে লেজ নাড়ছে, অর্ধেক খিদে সে বিকেলেই গিলে নিয়েছে, বাকি অর্ধেক তোলা আছে ভোরের জন্য। সকাল হলে সূর্যের আলো যখন এই কংক্রিটের জঙ্গলকে ছুঁয়ে যাবে, তখন জাদুর মতোই প্লাস্টিকের পাত্রে কোনো এক দয়ালু হাত বিস্কুট রেখে যাবে। ততক্ষণ এই নিস্তব্ধতাই শ্রেয়, সব শূন্যতা তো আর নিজের চিৎকার দিয়ে ভরিয়ে তোলা যায় না, তাই না বস?
মেয়েটা
মেয়েটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মুখ মুছছিল
তার ঠাকুমা বলত, “মেয়েদের বেশি চোখে পড়তে নেই।”
মা বলত, “সেফ থাকাই বুদ্ধিমানের কাজ।”
শহর বলত, “হাসো, তবে বেশি না।”
তাই মেয়েটা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে
প্রতিদিন একটু একটু করে
নিজের মুখ মুছছিল।
লিপস্টিক আগে গেল। তারপর হাসি।
তারপর সেই বেয়াড়া প্রশ্নগুলো।
শেষে শুধু দুটো চোখ রইল—
অন্ধকার দোকানের সিসিটিভির মতো।
একদিন রাতে লোডশেডিং হল।
আয়না কিছু দেখাতে পারল না।
মেয়েটা তখন প্রথম বুঝল,
অদৃশ্য হওয়ারও একটা শব্দ আছে—
খুব আস্তে
পোড়া তারের মতো গন্ধ।
উল্টো পাখি
সেদিন আকাশটা এমন নিচু ছিল
মনে হচ্ছিল পুরোনো স্কুলব্যাগের ভেতর ঢুকে গেছি।
মেট্রোয় সবাই মোবাইল দেখছিল:
দেশ, যুদ্ধ, ডিসকাউন্ট, ব্রেকআপ—
সব একই স্ক্রলিং গতিতে নেমে যাচ্ছিল আঙুলের নিচে।
হঠাৎ বাইরে দেখি
একটা পাখি উল্টো হয়ে উড়ছে।
কেউ খেয়াল করল না।
আমার পাশের লোকটা
মিউচুয়াল ফান্ড নিয়ে ফোনে চেঁচাচ্ছিল,
যেন মৃত্যুকেও SIP-এ ভাঙা যায়।
ভাবলাম, হয়তো
পৃথিবীটাই আসলে উল্টো হয়ে গেছে অনেক আগে।
আমরাই শুধু সোজা সোজা হাঁটার অভিনয় করছি
অভ্যাসের কারণে।
(৬)
শব্দ করো না—এসো নীরব হওয়ার গান গাই
কাশফুল বিছানো রাতে আমার মাথার ভিতর দিয়ে ট্রেন চলে যায়—
স্টেশনহীন—একটা অনন্ত চলাচল
চিৎকার আটকে গ্যাছে—গলায় শুকনো লবণের মতো
জিভ শুকিয়ে ক্যাকটাস—
কান চেপে ধরলেও শব্দ ঢুকে পড়ছে—
গাঁজার ধোঁয়ার মতো ছড়িয়ে যাচ্ছে অঙ্গে
আমি হয়তো ভেঙে যাচ্ছি ক্রমাগত
(৭)
প্রতিলিপিতে ভরা পথের চক্রবুহ্য—
প্রতিটি মোড়ে আমি—আয়নার অসুখ
এড়িয়ে যাচ্ছি—তবু সামনে এসে দাঁড়াচ্ছে বারবার
রাস্তা নরম—কাঁচা মাংস
পা ডুবে যাচ্ছে—ধীরে—অপরাধের মতো
কেউ দ্যাখেনি কিছু—
কারণ হারিয়ে যাওয়ার দৃশ্য—সবচেয়ে নিঃশব্দ
আমি তলিয়ে যাচ্ছি—
নিজেরই পুনরাবৃত্তির ভেতর অচিরে
(৮)
ঘুম ভেঙে যাওয়ার কোনো ভয় নেই আমার—
কারণ অনুপস্থিত জাগরণের যন্ত্রণা আমাকে—
অবসাদগ্রস্থ করে তুলেছে
বিছানার নিচে জমে থাকা শ্বাস—
একটা লুকোনো প্রাণীর মতো ওঠানামা করে
আমি নড়লেই থামেযায়—
আমি স্থির হলেই আবার বেঁচে ওঠে
অপেক্ষা—একটা টানটান তার—
চোখ বন্ধ করে ফেলি—
ফিরে যাওয়ার মুহূর্তটা বিলম্বিত বজ্রপাত
নিজেকে দেখেই চমকে উঠি—পরিচয়ের ত্রুটিতে
(৯)
সামনে এগিয়ে যাওয়ার কোনো সময় অবশিষ্ট নেই
প্রতিটা সকাল উল্টো হাঁটা ঘড়ির অসুখ—
গতকালের ধূসরতা আমি মাখতে চাইনি
কিন্তু আমার আঙুল কেটে যাচ্ছে স্মৃতিচারিত রক্তে
ঝড়ে পড়ছে কালো ধোঁয়া
সময় আমার ভেতরে পচে মৃত ফলের মতো গন্ধ ছড়িয়ে দিয়েছে
আমার সময় বারুদের মতো ফুরিয়ে আসছে চন্দ্রিমা
(১০)
ফিরে আসা—একটা অনিশ্চিত প্রতিশ্রুতি—
আমি থাকব না—স্থানচ্যুত বস্তুর মতো বয়ে যাব
প্রতিসন্ধ্যায় আকাশ নিচু হয়ে আসে—
এক প্রকাণ্ড দানবের হাত রাখে আমার কাঁধে
আমি তাকাতে পারি না তার দিকে—
কারণ তার চোখে আমি দেখিফেলেছি আমারই অন্য দৌড়—
তাই বসে থাকি—মৃত্যুমুখী স্থিরতায়—
থেমে যাওয়া—সম্ভবত সবচেয়ে অপ্রাপ্য গতি,
শরীর যখন মানচিত্র
হাঁ'-এর ভেতর গা-ঢাকা দিয়ে আছে দৈনন্দিন পথ
ভেতরে ফিসফিসানি শব্দ
মনে হচ্ছে ঠান্ডা ঋতু খুব করে জেঁকে বসেছে
শরীরের খনন প্রক্রিয়া বন্ধ হয়ে গেছে
হাঁটুতে নীল বারুদ
শিরদাঁড়া শহর
সূর্যোদয় চোখ
মুখ আগুন
বুক নদী
যেন একটা কবর মানুষের মতো জ্যান্ত হয়ে উঠেছে
নাভি মূল
মাটির স্তম্ভ
শেকড় ছুটে যাওয়া পচন বুকের কাছে ফিসফিস করছে
বদলে যাওয়া পথ
তার বটগাছটা জুড়ে বৃষ্টি বৃষ্টি হাওয়া
রুদ্ধদ্বার গল্পে গোলাপের কাঁটায় বিষ ছিল না
মানুষ নয় কঙ্কালের অলঙ্কার ঝুলছিল আকাশের দরজায়
আকাশ আকাশ বেদনা উড়ছিল বৃষ্টির বারুদে
কাগজ ছেঁড়া মেঘ ছাড়পত্রের সাক্ষরের সাক্ষী নক্ষত্রকে দেখে জোছনার মতো ফুরিয়ে যাচ্ছে।
ধাতব আগুন জ্বলছে
বৃষ্টির বাড়ি থেকে ফিরে আসা কান্না দ্রোহসিক্ত হয়েছিল
জমাট রক্তের ওপর দাঁড়িয়ে দেখেছিল চুরি যাওয়া সূর্য
নাভিমূলে উড়ে বেড়ানো পতঙ্গ পালিশের দোকান থেকে পিতল রং কিনে সোনা রং করে
সেই থেকে কে পিতল, কে সোনা দাদার গুগলি ধাঁধার মতো
অথচ সোনা আরও গভীরে শেকড় ধরে দাঁড়িয়ে
ধাতব আগুন বুকে নিয়ে জ্বলছে
চোখে মেঘ আগুন ফুলকি ওড়া বিদ্যুৎ
ঠোলা ওঠা আকাশ
রক্ত পুঁজের তারা জ্বলা তীরে এসে দাঁড়িয়ে তার ছেঁড়া সেতারটা কাঁপছে
শত্রুর বুক চিরে ঢুকে পড়া ঢেউগুলো একদিন পৌঁছে যাবে সোনার দেশে।
দোদুল দোলে সুরের দিগন্তে
সবুজ উবে যাওয়া প্রতীকী রং
প্রলেপ প্রবণ
ঘুমন্ত প্রায়
চেতনায় পাতার বসন্ত নেমে আসে
শোষণ আর দুষণ মুক্ত
সে এক প্রেমের উপাখ্যান উপাদেয় সময়
মেঘের মতো বালুচর ঘুমপাড়ানি গান শোনালে—
জাগরণে জলজ অনুভূতি বৃষ্টির বৃদ্ধাঙ্গুলিতে কপাল চাপড়ায়
স্বপ্ন রাঙা হলুদ পাখি, হলুদ চাঁদ ব্যাঞ্জনা দায়ক শিশিরে স্নান সেরে
পরণে নতুন সকাল জড়ায়
ছুঃ-মন্ত্ররে সূর্য কুসুম হাসি ধরা সমকাল
অনলাইন বাঁশিটা স্পর্শে শস্যশ্যামল দুরারোগ্য অন্তর
প্রশ্রয়ের কবিতারা হাত-পা ছোড়ে, নখ ভাঙে নৈঋতের কান্নায়
আরও কোনো শ্বেত সমুদ্র পাঠ বুঝে নেয়।।
দৃশ্যান্তরের দৃশ্য
ধীর
বধির বিনায়ক দৃশ্যান্তরের দৃশ্য
বনতল শেলাইয়ে নুয়ে আছে বৃক্ষ
রোদ্দুর তান্ত্রিক ছায়াগুলো ছলছল জলের পিপাসা
পিষে যায় ঘাস পেরেকের পিঞ্জর
পলির পাললিক ঋতু খননে বসে আছে পোয়াতি লবণ
আর খাল ভরে ওঠা মাটির মননে হুগলার বেহুদা বসত
উড়ন্ত উপকূল
নদী তার ডিঙি
জাল টানা রমণী নীল চোখের কাজল
ক্ষুধা কুড়ানো নীরবতা নির্দয়
প্রশ্নান্তরের লৌকিক বিস্ময় বিনোদনের দুপুর দুয়ারে উড়িয়ে দিচ্ছে জীবনের ক্ষয়
ডেও পিঁপড়ে বোনা সংকল্প আর পথ কাটা পথ
ধ্যানস্থ রূপ, গুণ, বোধ ধারক একান্ত প্রান্তর
মানুষ তার বীণা বাদক প্রাণ
জিজ্ঞাসাবোধক হয়ে বসে আছে
অনুভূতি বিলানো বিলাপ লেগে আছে যন্ত্রণার হৃৎপিণ্ডে।
জীবনটা ঋণাত্মক
উল্টোদিকে গোনার মত,
সলতেটা পুড়ছে,
বাইরে থেকে দেখলে
বাড়ছে একটা শরীর,
ওদিকে ক্ষয়ে যাচ্ছে ভেতরে
যা কিছু রক্ত মাংস -
অনন্ত এক ক্ষয়;
মৃত্যুশীতল ভয়
অন্ধকার হয়ে ছেঁকে
ধরছে চারপাশ থেকে,
একাকী নিস্তেজ আলো
শেষবারের মত কাঁপছে
টিকতে চেষ্টা করছে,
মোম আর না জ্বললেই
সত্যি সবথেকে ভাল হয়,
অন্তত জীবন নামের
নিরর্থক এই দহন থেকে
সব সলতেরা রক্ষা পাবে।
নোংরা জীবন -
খাওয়া-হাগা-মরা-
এটাই সংক্ষিপ্ত রুপ,
নিঃসঙ্গ দিনযাপন
রোজ রাতের অনিদ্রা,
মাংসল আরামের
আনন্দে শীৎকার,
ঘেমে ওঠা দেহ,
চাদরে কদর্য
ছোপছোপ দাগ,
পরনের প্যান্টে,
এমনকি দেওয়ালেও;
বাকি রাতটুকু
চোখ বুজে
মড়ার অভিনয়,
ভোর হতেই
পাখিদের বিরক্তিকর
কলকাকলি আর চিৎকার,
জ্বলন্ত চোখ ডলতে ডলতে
উঠে দাঁত মুখ মেজে ঘষে
প্রথমে কিছু পচা গলা
খাবার গলা দিয়ে নামানো -
খাদ্যনালি দিয়ে সব
নিরন্তর ভ্রমণ করে, রূপান্তরে
শেষে কী হয়ে বেরোয়
তা তো সবাই জানে।
এই এক চক্রেই জীবন
সবার আবর্তিত হয় সমানে,
বিরক্তিকর এই অন্তহীন
চংক্রমণ - নাম যার জীবন।
ইঁদুর দৌড় - ইঁদুর কেন
সব শালা পোকামাকড়
সব্বাই ভারি বুটের তলায়
পিষেই যাচ্ছে নিরন্তর - প্রতিবাদহীন।
কোথায় এর থেকে মুক্তি?
মোম যদি কভু না জ্বলত?
যদি সব সময় আঁধার থাকত?
সলতেরা খুব কষ্ট পায়
আলো দিতে গিয়ে
আর মোমও গলে পড়ে
জীবনের দহনে।
শুধু আঁধার থাকুক, তার ওপারে
কী আছে তা না হয়
অজানাই থাকুক,
বিস্মৃতির অতলে।
আফসোস একটাই -
যদি শুধু দেখে যেতে পারতাম
দুটো চোখ দিয়ে নিরন্তর
এই পৃথিবীকে, না থেমে অবিরাম;
অনুভূতির লোভ আছে প্রবল
আমার মধ্যে, যদি শুধু দুটো চোখ
থাকত, আর দুটো কান শোনার জন্য,
একটা নাক গন্ধের জন্য, জিভও -
যদি শুধু সব ইন্দ্রিয় সজাগ থাকত,
মায়াবী, অমর হয়ে চিরকাল-
তাহলে সুন্দর থেকে অসুন্দর
সব কিছু - ফুলের মিষ্টি বাগান
থেকে শশ্মানের পচা লাশ,
শিশুর হাসি-কান্না থেকে বোমা
গুলির গর্জন, যৌনতা থেকে
ধর্ষণ, আলিঙ্গন থেকে নিয়ে
রক্তাক্ত মারামারি, আকাশে উড়ন্ত
নিঃসঙ্গ ফানুস থেকে ড্রোন আর
মিসাইল, দামি রেস্তোরায় পরমান্ন থেকে
কুকুরের পায়খানা খাওয়া, মায়ের কোলে
ঘুমন্ত বাচ্চা থেকে ড্রেনে ভাসা নবজাতকের
লাশ, উৎসবে খুসী ভিড় থেকে নিয়ে
রাস্তায় বিশৃঙ্খল ক্রুদ্ধ মানব মিছিল,
পৃথিবীর বুকে সুন্দর অসুন্দর সব কিছু - সব দেখতাম,
ঘ্রাণ নিতাম, চেখেও দেখতাম - স্রেফ স্বাদ
নিতাম আরকি, ছুয়েও দেখতাম পারলে;
জীবনের দহন চাইনা, শুধু এইভাবেই বেঁচে থাকতে চাই।
চিরটাকাল, যতদিন মেয়াদ বাকি আছে এই দুনিয়ার
ততদিন - এভাবেই শুধু দেখে যেতে চাই - সবকিছু।
[১]
পাহাড়ি জ্যাজ: মৃত সঞ্জীবনী
গম রঙা ক্লারার্কা প্রজাপতির পাখা থেকে
কুড়িয়ে এনেছে একটি হলুদ বিকেল
চোখে এক টুকরো শেওলা মেখে
স্বপ্ন আঁকে জলসীমায়
এখানে চায়ের কেটলিতে ফুটতে থাকে মৃত সঞ্জীবনী
উমিয়ম লেকের ধার ঘেঁষে নীলছাতাটির নিচে
চিনে বাদামের ঠোঙায় ওলট পালট জীবন
ধোঁয়াটে পাহাড়ের গায়ে তবুও লেপ্টে আছে কিমরং
মেঘের চাঁদোয়া ফুঁড়ে বেরিয়ে আসে জ্যাজের টিউন
ক্লারার্কা এখানে জন্মেছিল তাই….
[২]
পাহাড়ি জ্যাজ: একটি হলুদ বিকেল
আজ ক্লারার্কা স্কুলে যায়নি
বৃষ্টির ভেতর তার নীল স্কার্টে আটকে ছিল
দুটি নাম না-জানা প্রজাপতি
উমিয়মের জল দূর থেকে দেখে মনে হয়
কেউ ঘুমের মধ্যে একটি দীর্ঘ চিঠি লিখছে
পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসে কুয়াশা
আর চায়ের দোকানে বসে বৃদ্ধেরা রাজনীতি নিয়ে তর্ক করে
ক্লারার্কা চুপচাপ নিজের খাতার কোণে
এঁকে রাখে একটি হলুদ বিকেল….
[৩]
পাহাড়ি জ্যাজ: গম রঙ আলোয়
সন্ধ্যা হলে পাহাড়গুলো তাদের সবুজ পোশাক বদলে ফেলে
ক্লারার্কা হেঁটে যায় বাড়ি ফেরার পথে
পাইনবনের ভিতর
বাতাসে ভেসে আসে দূরের গির্জার ঘণ্টা
মনে হয় ঈশ্বরও বুঝি আজকাল একটু জ্যাজ শোনেন
মেঘের ভিতর লুকিয়ে থাকা আলো তার গমরঙা মুখে এসে পড়ে
পৃথিবী এখন খানিকটা ক্ষমাপ্রবণ ….
[৪]
পাহাড়ি জ্যাজ: জলসীমায়
ক্লারার্কা জানে না সমুদ্র কাকে বলে
তার সমস্ত ভূগোল এই পাহাড়, এই লেক,
আর মেঘের ভাঙাচোরা সংসার
মাঝে মাঝে উমিয়মের দিকে তাকিয়ে তার মনে হয়
জলেরও বুঝি কোথাও চলে যাওয়ার ইচ্ছে থাকে
উমিয়মের নীলে তখন ভেসে থাকে একটি কবিতা….
[৫]
পাহাড়ি জ্যাজ ও পুরনো মেঘ
আজ অনেকদিন পরে ক্লারার্কাকে দেখা গেল না
শুধু একটি হলুদ প্রজাপতি ঘুরে বেড়াচ্ছিল
চায়ের দোকানের আশেপাশে।
কেটলিতে ফুটছিল জল
পাহাড়ের গায়ে পুরনো মেঘেরা বসে ছিল
কেউ একজন যেন এইমাত্র একটি অসমাপ্ত গান রেখে গেছে
পাড়াতো বানর
পৃথিবীর কোনও গল্পে এই বানরটি নেই
যে আমাদের বাড়িতে এসেছে গতকাল
গাছ থেকে গাছে লাফিয়ে বেড়াচ্ছিলো
স্বরসন্ধির আড়ালে তার উজ্জ্বল গরিমা
ডুমুর পাতার দিকে ঝুঁকে থাকা রেণু
উঠোনে কলার থেকে অভিমানে খসে যাচ্ছে বোতাম
শুকনো বৃষ্টির পরে অ্যানিমোমিটারে বাড়ছে হাওয়া
বিব্রত বানর কোথায় লুকিয়ে আছে কে জানে!
মা তাকে খুঁজে হয়রান
কলার কাদি হাতে
সাথে ক’টা খুচরো বিস্কুট
পৃথিবীর কোনও বনে এই বানরটি নেই
চুপচাপ বসে আছে পাতার আড়ালে।
ক্রিয়ার বাগান
বিপন্ন সমস্তটুকু জুড়ে একটি অট্টহাসি
চেপে বসেছে, দুধশাদা রাজহাঁস
দূরাগত চিত্রকর বসে আছে, সদাহাস্যরসে
পানপাতা শুষে নিচ্ছে আলো
ময়দানে তুমুল ইশারা, দশদিক জমকালো।
তোমার ছায়ায় দাঁড়িয়ে
একটানা
কথা বলে হেসে নিচ্ছি
রোদে
শুকিয়ে নিচ্ছি ঘ্রাণ৷
তবুও সকল বিষণ্নতাজুড়ে ঘুমিয়েছে ক্রিয়ার বাগান।
ব্রিজ, ব্রিজ
জুতোর মাপে পা এঁকে নিচ্ছি। ব্রিজের উপর ব্রিজ
ভেদ করে পুলিশের গাড়ি, অথবা অ্যাম্বুলেন্সও
হতে পারে। পরিচিত ধানক্ষেতজুড়ে ভ্যানগঘ।
হাইফেন চক্রের পাশে আমি ও মহোদয়
লুফে নিচ্ছি জলের শুশ্রূষা।
ভ্রান্তিটুকুই বাঁচিয়ে রাখবে আমাদের
দেখে নিও—
হাহাকারে নষ্ট হবে চোখ৷
এই বুদ্বুদগুলো নদীর নিঃশ্বাস
বেঁচে থাকার চিরকৌশল—
উড্ডীন পাখিদল
আমাদের ভেতরে রেখে যাচ্ছে ডানার ছায়া।
তার চোখে চেনা জল, ঠোঁটে অসংখ্য ঢেউ
একটি ডানায় লিখছে লুপ্ত রোদের ইতিহাস।
(২)
তোমাকে দেখেই শরতের ছিটোনো মেঘের কথা মনে পড়লো
ভীষণরকমের শাদা অথচ নিঃসংশয় ভেজা
প্রতিটি ভাঁজের আখরগুলো গেঁথে গেল আমার চোখে
আমার সব থেকে ভালো লাগে কাঁধের উপত্যকা
এখানেই চামড়ার পাঁচটা শেডের রামধনু উপচে পড়েছে
হাতের প্রান্তর, অসমান মরুরেখা,—
প্রতিটি উত্তল সোনালি খাঁজ জমে থাকা প্রিয় খয়েরী স্বাদ।
(৩)
এইসব রাতে ভেবেছি
কবিতা লিখতে হবে।
কয়েকটুকরোতে ভেঙেছে মদের গ্লাস।
বলছি তোমাকে, শান্ত হতে হবে
জল হতে হবে একটু হালকা নেশার মতো।
ফুটন্ত রক্ত তবু গড়িয়ে পড়বে না।
চলো ছিঁড়ি নিখুঁতের কবিতা, ক্ষুদ্ধ হতাশার বিবর্ণতা।
অ্যাকোরিয়ামে মাছগুলো উড়ে প্রজাপতি
ছড়িয়ে পড়বে ল্যাম্পের আলোয়।
নিজেকে পুরুষ ভেবে উক্ত ঘৃণা শরীরে মাখিয়ে নেবো।
(৪)
জানালা দিয়ে রাতটাকে গাঢ় হতে দেখি...
আমার মাথা থেকে আরও তীব্র হবে আলো।
এই উঁচু বিছানা থেকে
পড়ে গেলেই আমি মরে যাবো।
কেন হাত-পা নড়ছে না!
নিজেরই লাশগন্ধ,—তড়িঘড়ি ঘুম ভেঙে ফেলি।
কী অসহ্য এক বাঁচা, কাঠ-পুতুল থেকে ক্ষয়ে ক্ষয়ে...
আরও কয়েকটা রাত।
(৫)
আর ভালো লাগছে না
সামাজিকতার নষ্ট আগডুম বাগডুম,
কাগজগুলো আগুনে ধরে
যখন আস্তে আস্তে পুড়তে দেখি...
মুখে ছাই মাখি আঙুল ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে;
প্রতিটি রাত্রি চোখের গভীরে ঢুকে যাচ্ছে
মোমবাতি কয়েকটা মথের মৃতদেহ নিয়ে পড়ে আছে,
সবকিছু ভাঙার একটা আস্ত হাতুড়ি চাই,
অথবা একটা সিগারেট অনায়াসে টানার সময়টুকু...
এখনই জেগে ওঠা উচিত, নইলে এক্ষুনি সবকিছু শেষ হয়ে যাবে।
মহুল রেণু
লাল পশমের মতো শৃঙ্খলা বুনতে বুনতে
উদ্ভিদের নীরবতায়
মাছের কানকোর ভেতর থেকে বেরিয়ে এসে
তোমায় নিয়ে লেখা হয়ে উঠে না
মাটির গভীরে জয়ন্তী ঘাসের শরীর
অদ্ভুত বিষণ্ণতায়
মন্দাকিনীর কোল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে
তোমায় নিয়ে লেখা আর হয়ে ওঠেনি
তুমি হাতছানিতে ধোঁয়া ওঠা শিশির
দেখাবে বলে
চোখের কোলে সূর্য এঁকে শুকনো ঠোঁটে রাখ
মহুল রেণু
আঁচল সরিয়ে চৌচির বুক তোমাকে দেখিয়েছিলাম কবে
ভুলে গেছ হয়তো…
উরুর মৃদু সঞ্চালনে
(১)
নেগেটিভ ফটোগ্রাফগুলোর মতো আমাদের প্রত্যেকটা চুম্বন দৃশ্য আমি পুড়িয়ে ফেলছি;
ভোররাত পর্যন্ত একটা কাকের একটানা অসুস্থ ডাকের মতো তোমার নাম,
একটু একটু সম্ভ্রমের সাথে ফিরিয়ে দেবো মাসে মাসে, বৎসরান্তে আমার বাম-স্তনের দিকে তুমি মুখ ফিরিয়ে শুয়ে থাকবে;
আমার ঠোঁট কাল সন্ধ্যা অবধি কাঁপতে কাঁপতে ভূমিকম্পের মতো আতঙ্ক ঢেলে দিয়েছে আমার সারা শরীরে,
তারপর তোমার নামের নির্যাস মুখে নিয়ে আমাদের বিকৃত চুম্বন।
(২)
উরুর মৃদু সঞ্চালনে আমাদের যৌথ ক্যানভাসে আরেকটা ধ্বংসের আকার,
আঙুলের ওপর আঙুলের ছাপ দিয়ে আমরা আর কতদিন রাত আঁকব?
যদি যীশু খ্রীষ্টের ক্রুশে আরেকটা আত্মা পেরেকবিদ্ধ হতে হতে দ্বিতীয় আগমনে সায় দেয়
আমিও তোমার সাথে আত্মহত্যার সিগারেটে ফু দিয়ে উড়িয়ে দেবো ফ্যাসিবাদের জীবন।
(৩)
এইভাবে আরেকটা আকস্মিক ঝড়ে আমাদের চুম্বন নিষিদ্ধ,
ধূসর বাহু ধরে বেয়ে আসতে আসতে সিমেন্ট হয়ে গেছে আমাদের নাকে নাক,
তোমার বুকের রোম পুরাতাত্ত্বিক হ্রদের জলে ভিজিয়ে গেছে আমার জিভ,
শুভ্র আলোয় আদিম গুহাচিত্রের মতো দাম্ভিক অস্তিত্বে আমাদের চোখে চোখ;
যদিও পর্যটনের অভাবে একদিন হারিয়ে যাব বেদানার মতো লাল দানাদার শরীর হয়ে।
(১১)
এ অনন্ত ঘুমে বড্ডো ক্লান্ত হয়ে পড়ছি
নাথুপালের শেষযানে তোমায় মৃতদেহের মতো
শহর তোমাকে টেনে নিয়ে যাচ্ছে—ধাতব স্ট্রেচারের বদলে ভেজা পোস্টারের পিঠে,
আঠা হয়ে উঠছে জিভ—নর্দমা তার উষ্ণ অন্ত্র খুলে রেখছে নিচে,
দেয়ালের খসে পড়া চুন—ক্ষয়ে যাওয়া অস্থি—তোমার মুখের ভ্রূণরেখা ধরে রাখে;
আমি ফেলে যাচ্ছি—পায়ের নিচে কাগজ-সোঁদা বিকেল,
আঙুলে লেগে থাকে রঙ—ছাপাখানার ক্ষত—
ভুল বানানগুলো না শুধরিয়ে আরও গভীরে ঠেলে দিচ্ছি কালো দাগে।
ট্রামের তারের মতো টানটান স্নায়ু—
ঝুলন্ত গোধূলী—বিদ্যুতের মতো থরথর রোদ—মস্তিষ্কের ভিতর ছিঁড়ে যাওয়া সংকেতের মতো;
তাই কাচের ধুলোয় এঁকে ফেলেছি বৃত্ত—
তার ভেতর ঘুরপাক খাওয়া অপরিচিত মুহূর্ত—
ধাপে ধাপে নেমে যাচ্ছে—ভাঙা সিঁড়ির মতো নিম্নগামী—
আর প্রতিটি ধাপই নিজেকে খুঁড়ে নামার অনুশীলন।
"হাতের ভেতর কি একটু বেশি চাপ ছিল?
নাকি শুধু ভুলে গিয়েছিলাম ছেড়ে দিতে?"
আমি বোধহয় হারিয়ে ফেলেছি অভ্যাসের নিয়ন্ত্রণ—
এসব কি লিখে ফেলছে—যৌনতার মতো কেঁপে ওঠা দুহাত—
উপরের বেফালতু অভিব্যক্তি ছেটে দিচ্ছি—সের্ফ মার্ডার
এইসবকিছুর মাঝে মধ্যিখানে জমে যাচ্ছে শহর—
উষ্ণ ফুটপাত, সদ্য ব্যবহৃত চামড়ার মতো,
রেললাইনের ফাঁকে আটকে থাকা অক্ষর—সভ্যতা সৃষ্টির আগের ডেথ মেটাল,
কাগজের ভাঁজে জমে থাকা আলো—একটা আটকে পড়া শ্বাস;
ক্ষুদ্র অযত্ন—ধুলো, ছেঁড়া পোস্টার, কাচের কণা—
একত্রে গড়ে তুলছে অনির্ণিত বিস্তার—
যার মধ্যে হাড়ের মতো শব্দ করে ক্ষয়ে যায় সময়।
তোমার ভেতরের আলোর চারপাশে বেঁধেছিলাম কাঁচের যে ঘর—
স্বচ্ছতা নয়—নিরবিচ্ছনতার নিঃশ্বাসরোধী বেষ্টনী,
এখন ঘন হয়ে আসছে ছায়া—জমাট শুক্রাণুর মতো—
চোখের কোণে উষ্ণতা জমা ভারী পিণ্ড,
আর সেই ভারেই ডুবে গ্যালো সমাপ্তি—
শব্দহীন—য্যানো গলায় আটকা পড়েছে চিৎকার।
পথের ধারে এই মুহূর্তগুলো—ডাকনামের মতো নিষ্ক্রিয়—
সরাতে গ্যালে আঙুলে লেগে যায় দাগ,
দাগের ভিতর কেঁপে উঠছে আলো—
গোল হয়ে ফেটে পড়ছে—
মেঝেতে ছড়িয়ে পড়া কাঁচের ঝলকানি অন্ধ করে দিচ্ছে চোখ;
শহরের মোড়গুলো তখনই স্তরায়ণে বিকৃত হয়—
বিকৃতির মধ্যে জমা অর্ধেক যাপন—পেশির মতো শক্ত হয়ে—
একটা অদৃশ্য রেখা কেটে যাচ্ছে দূরত্বের—
সেই রেখা ধরেই সূর্য ওঠে প্রতিদিন—লোহা-জুতোর দমবন্ধ শব্দে।
একটি আয়না দাঁড়িয়ে—প্রতিটা শ্রেণিকক্ষে মুখ—
প্রতিটি কক্ষই সরে আসছে আমার দিকে—খোলসের মতো ঢাকা ত্বক বেয়ে—
তৈরি করছে ফাঁক—হাড়ের ফাঁপা গহ্বরের মতো,
ফাঁকের ভিতর ঢুকে পড়ছে ঘুম জ্যোৎস্নাহীন রঙ—
রঙ জমে থকথকে তরলের কঠিন বিন্যাস—
অতিরিক্ত স্পর্শ পাথরে রূপ ন্যায়—
নড়াচড়া হারানো এক স্থির বিদীর্ণিতা।
আমি স্থবির চোখে দেখছি—আঙুলের কালি শুকিয়ে গ্যাছে—
শুকনো কালির ওপর দিয়ে বয়ে যাচ্ছে ক্ষুদ্র সমুদ্র—
সমুদ্রে ঘুরছে সেই ছায়াবৃত্ত—
যে বৃত্তে ঢালাই হয় তোমার অনুপস্থিতি—
আমি প্রতিটি ছাঁচের ভিতর রেখে গেলাম
নিজের হাতের সব দাগ—
মুছে যাওয়ার আগেই যেগুলো স্থায়ী হয়ে উঠেছে।
ফলত বসন্ত আর আসবে না চন্দ্রিমা
তাই এ কাব্যের শেষপাতাটা নিঃসঙ্গ পরে আছে আজও
রাংতা-মাঠের কাহিনি
রাংতার মাঠে ফিসফাস, ডাহুকের ছায়া
আগুনসন্তাপে উধাও বাড়িঘর!
শুধু কিছু শিউলির ঘ্রাণ লুকানো
জুতার বাক্সে
তারপর, কত নির্জন দুপুরে
রোদকে আগুন ভেবে পালিয়েছে বৈমাত্রেয় ডানা!
সুদূর শূন্যতায় ভেসে ওঠে শাদামাটা রেখা
মেঘ তার কতটা উত্তাপ ধারণ করতে পারে!
ধূর্ততা ও সাইরেন পুড়িয়ে দিচ্ছে ঠোঁট
গোপন হিংসায় কেঁপে উঠছে অপাদমস্তক
কোথাও সমুদ্র আছে
আশ্চর্য জ্বরের ভেতর এটুকু শান্ত-স্বস্তি।
সাগর স্বরলিপি জানে
তীরঘেঁষে যেটুকু লিপি অস্পৃশ্য ভালগার
মিশে গেছে দুপুরের রোদে, আশ্চর্য ধূর্ততায়
আনত ভূমির কাছে দুলে ওঠে অন্ধকার
হাতিরা স্নান সারে উজ্জ্বল গরিমার দিনে
এখানে এমনই আগুন—বনের জীবন
সাইরেন ফেলে পালিয়ে যাচ্ছে প্রহরী।
কিছুটা হিংসা ভুলে তুমি দূর পাতাল থেকে
বাড়াও হাত-ভর্তি রেণু।
স্বরলিপি—ওই পত্র থেকে দুলছে সাগর
দ্যাখো বাদ্যযন্ত্রসমেত দুলে ওঠা শাখায়-পাতায়।
প্রাচীর ভেদ করে এগিয়ে যাচ্ছে ঢেউ,
তোমার চোখে বালি ও ফেনা; আস্ত সাগর…
এপিটাফ
অলীক বর্ণমালা কিছু, ভেসে আসে ওপার
সমুদ্র থেকে৷ আমি টের পাই—আছড়ে পড়া
ধ্বনি৷ হৃদয়ের পাড় ঘেঁষে অনেক আঁচড়!
মখমল সেতু৷ মাল্টিকালার প্রেম৷ টের পাই।
জুতার বাগানে লুকিয়ে থাকা শব্দ, আড়ালপ্রিয়
আমারই মতোন তারা অন্ধকার ভালোবাসে।
আলো দেখে আড়ালে লুকায়! সমুদ্র ডাকে।
দুপুরের রোদে হেসে ওঠে চকচকে দাঁত।
এইসব চকমকি রোদের গল্প তোমার কাছে
আর বলা হবে না৷ খামোখা হাসির শব্দ
টের পাই৷ পড়ে থাকা লাল—বলা হবে না।
কুন্তলীন
(১)
ছুঁচের বিচার চলে চালুনির দেশে বিচারক দিনে-রাতে আরশোলা খেয়ে তৃপ্তি-ঢেঁকুর তুলে স্যাটা-ভাঙা রায়ে চুলকানি তুলে দেয় ছুঁচেদের গায়ে। চুলকানি জমায়েতে বিপরীত-বাদে নির্লোম বগলের অবোধ প্রকাশে পুরুষালি বিছানার কোলবালিশেরা ফুটন্ত ইচ্ছের মিয়োনো ছোঁয়ায় ফাই-থাই বুকে ধরে গুমরিয়ে কাঁদে। আয়নারা বলেনি কি রাইকে কখোনো গৌর অঙ্গে মিত কৃষ্ণ কাহিনি কী ভীষণ দাণ্ডিক উত্থান টানে এমনকী প্রৌঢ় বালিশ-বিছানা আর রাত-পোশাকেরা স্বর্গ-সুখ-দেশ-ম্যাপে লাঞ্ছিত হয়ে ওয়াশিং মেশিনের গর্ভ ভরায়।
(২)
বলখেলার মাঠ প্ল্যাটিহেলমিনথিস শ্রেণিতে মুক্তি ছড়িয়ে কর্ডাটা পর্বে ‘করে দেখি’ উসকে ব্রন-বেলায় ‘করে দেখা’-র দ্বান্দ্বিক সম্পর্কে থিতু হয়েছিল বটে কিছুদিনের জন্য তবে সকলেই জানতুম অসুখে দাড়ির সুখ সইবে না বেশিদিন।
আজ ঝুনো ঝোঁকে ঝুঁকে পড়ে দেখি সেই মাঠের দক্ষিণ দেশ ডাক-বালিকা (অন্তত আমার ডাকে সাড়া দিতে যাদের বয়েই যায়নি)-দের জঘন প্রদেশ হয়ে পৃথিবীর সমস্ত রিমুভারের বিজ্ঞাপন করছে।
কি ভীষণ চেঁছে ফেলা বাই মানুষের!
(৩)
নারকোল মুচির মতো গ্রন্থি যুগলে বিষ ব্যথা রাই জানে বলে “সুপুরি গাছের সারি”-র প্রতি কাণ্ডে লিখে রাখে “মটর-ভাঙার” কষ্ট কাহিনি লোনা জলে। নুন ফেলে জল উবে গেলে নুন অপরিহার্য ডলাডলি চায়। মাইয়া-র য়া কেটে আমার হয়ে ওঠে আর উত্তম থেকে প্রথম সবই তো পুরুষ, অগত্যা…
উত্তর-প্রদেশ সংরক্ষণ বিল সংসদে না আসা তক মাই মানে আমার ব্যাকরণ সম্মত। যে কোনো আন্দোলন দলন আশা করে। ঝারি মেরে খাড়া হয় উত্তরবৃন্ত শালা আঙুলে গিঁট বাঁধতে হয়। কেন রে বাপু? নরম নরম আর শক্ত শক্ত ব্যাপারটা কিন্তু লাভলি বস… উত্তেজনা লিঙ্গ নিরপেক্ষ হয়ে চোখে-চাটা মজা নিয়ে “চানঘরে গান” শোনে অঙুলের গিঁট খুলে।
সকলের চোখে মাপনি ফিট করা আছে তাই দ্যাখানোই দস্তুর যখন, তখন মানুষ কেন যে এত ন্যাকামি করে!