যুদ্ধের ঘ্রাণ
ব্রজ সৌরভ চট্টোপাধ্যায়
আজ থেকে প্রায় ১৬ বছর আগে যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল, ইতিউতি জঙ্গল ছিল আগে তখন। যুদ্ধটা যখন থামে তখন জঙ্গল নেই। জঙ্গলের ভেতর হালকা-পুলকা গ্রাম ছিল অনেকগুলো। রাতারাতি সেগুলো ফাঁকা হয়ে যায়। পৃথিবীর ইতিহাসে বোধ হয় খুব একটা এরকম ঘটেনি, ঘটবেও না সম্ভবত আর কোনোদিন। রাজধানী নয়, বন্দর নয়, বড় কোনো শহরও নয়, শুধুমাত্র ইতিউতি ছড়ানো এই জঙ্গলেই যুদ্ধটা শুরু হয়েছিল। বেশিদিন না, মাত্র সপ্তাহখানেকের যুদ্ধ ছিল। কিন্তু ভয়ংকর যুদ্ধ। এত মরা আগুন আর এত ছাই যে, এখনও এখানে লোকজন আসতে সাহস করে না। সরকার থেকে খুব উদ্যোগ নিয়ে হেরিটেজ-ফেরিটেজ তকমা লাগিয়ে লোকজন টানার চেষ্টা হয়েছিল কয়েকবার, হয়নি। প্রচুর স্ট্যাচু বানানো হয়েছিল, ফুরিয়ে যাওয়া জঙ্গলে ছাইয়ের গাদায় সেগুলো বসিয়ে দেওয়া হয়েছিল ধুপধাপ। কোথাও সাঁজোয়া ট্যাঙ্কের সামনে এক ফুটফুটে শিশু কোথাও একটা ভাঙা ঘরে অনেকগুলো মৃত আর মরতে চলা মানুষেরই মাঝে তাদের একমাত্র কুকুরছানা, কোথাও বা নিহত এক সৈনিক, যার হাতে সাদাফুল এইসব। সরকার থেকে প্রফেশনাল গাইডের ব্যবস্থা করা হয়েছিল। গাইড হওয়ার জন্য ফর্ম বিলির দিন, সে কী উৎসাহ মিডিয়ার লোকেদের, সে কী উৎসাহ সরকারের মন্ত্রীদের। মাঝখান থেকে স্টাম্পেড। চারজন মারা গেছিল। গাইড হওয়ার বিভিন্ন যোগ্যতার পাশে লাল কালিতে মার্ক করা একটা অংশে লেখা ছিল—প্রার্থীকে সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে থাকতে হবে/যুদ্ধ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন হয়ে থাকতে হবে।
যে চারজন স্টাম্পেড হয়ে মারা যায় সরকারের আইনজীবী প্রমাণ করে ফেলে তারা শুধু হুজ্জতি পাকাতেই এসেছিল। কারণ তাদের ফর্ম খুঁজে পাওয়া যায়নি। সুতরাং তারা যে যোগ্যতাহীনই শুধু নয়, ইচ্ছা করেই ঐ ভিড়ে মিশে সরকারের অপপ্রচার ও দুর্নাম করার চেষ্টাও করেছিল। শেষপর্যন্ত আর গাইডের ব্যবস্থা এভাবে সুষ্ঠুভাবে করা সম্ভব হয়নি। চেষ্টা হয়েছিল আরেকবার, গতবারের তুলনায় ভিড় হয়েছিল প্রায় দেড় গুণ। সরকার আশ্চর্য হয়ে পড়ে, আগেরবার ‘স্টাম্পেড’ এর ঘটনাকেই অনেকে ‘সরাসরি যুদ্ধে অংশগ্রহণ/যুদ্ধ অভিজ্ঞতার সম্মুখীন’ বলে ফর্মে ফিল-আপ করেছে। চাকরি মানে, গাইড হওয়া কারোরই হয়নি। প্যানেল বাতিল হয় আর তারপরে পরেই দুমদাম স্ট্যাচুগুলো বসিয়ে দেওয়া হয়। গোটা ২৫০ জনকে ব্যাজ পরিয়ে, চকরা বকরা মিলিটারি পোশাক পরিয়ে, খেলনা বন্দুক হাতে দিয়ে ‘গাইড’ বানিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবুও আইডিয়াটা ক্র্যাশ করে। জায়গাটায় এত মরা আগুন, ছাই, চাপা আর্তনাদ যে লোকজন আসেনি। এরমধ্যে ফাঁকা টিকিট কাউন্টারের ভেতরে চাকরি পাওয়া মানুষটা একদিন একটা চিরকূট লিখে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলে যায়।
লাশটাও ঠিকঠাক আবিষ্কার হয়নি। লোকজনই তো যেত না, আর যারা খেলনা বন্দুক নিয়ে কয়েকটা জায়গায় থাকত, তারা কেউ এইদিকে আসতই না। যে লোকটা মরেছিল কাচের কাউন্টারে, বলিহারি তার বুদ্ধি ছিল! ডিসেম্বরে ঝোলার সময় ঘরে এ.সি চালিয়ে রেখেছিল, ফ্রিজটা অব্দি খুলে রেখেছিল। প্রায় দেড়দিন পর বার্স্ট করেছিল এ.সি। উড়ে গেছিল মেইন ফিউজ। তখন লাইট অ্যান্ড সাউণ্ডের সময়। লোক হত না একটাও বলে অবশ্য রুলস অ্যাণ্ড রেগুলারিটির অভাব ছিল না। রোজ সন্ধে ঠিক ৭টায় এপ্রিল থেকে অক্টোবর আর সন্ধে ৬টায় নভেম্বর থেকে মার্চ অব্দি সিডিউল ছিল ‘লাইট অ্যাণ্ড সাউণ্ডের’ জন্য। ফাঁকা পড়ে থাকত অসংখ্য চেয়ার। শুধু গমগম আওয়াজে আর লেটেস্ট টেকনলজিতে ভরে উঠত চারপাশটা। ফাঁকা চেয়ারগুলোয় মাঝে মাঝে গাইডরা বসে পান, খৈনি, বিড়ি এসব খেত, তারপর সাহস বাড়ে তাদের। মদ আসে। আরও আরও সাহস বাড়ে। নেশার সাহস। সাহস বেড়ে গেলে তা অভ্যাসে মিশে যায়। লাইট অ্যাাণ্ড সাউণ্ড সেদিন বিগড়ে গিয়েছিল ফিউজ উড়ে।
খেলনা বন্দুকে লেজার লাইট জ্বেলে কয়েকজন এগিয়ে যায় টিকিট কাউন্টারের দিকে। কয়েকটা লাল লেজার লাইট, কয়েকটা সবুজ লেজার ঝুলে থাকা লোকটাকে এফোঁড় ওফোঁড় করে আবিষ্কার করে। মিলিটারি পোশাক পরা সবথেকে নেশাড়ু আর সবথেকে বাচ্চা ছেলেটা ক্যাটক্যাট করে বিরক্তিকর একটা আওয়াজ করে খেলনা বন্দুকে। আর চিৎকার করে বলে ‘হ্যাণ্ডস আপ’, ‘নাম খানকির ছেলে’। কিন্তু কীভাবে একটা লোক, যে কিনা প্রায় দেড়দিন আগে একটা চিরকূট লিখে গলায় দড়ি নিয়ে ঝুলে গেছে, সে কীভাবে ‘হ্যাণ্ডস আপ’ আর নিজেকে ‘খানকির ছেলে’ শুনে টুক করে ফাঁস খুলে মিলিটারি সাজা গাইড হওয়া নেশাড়ু বাচ্চাটার কাছে আসবে? হাঁটু গেঁড়ে বসবে? আর ভাববে, ইস দেড়দিন কী ভয়ানক ভাবেই না লুকিয়ে ছিলাম! শালা একবিন্দু জল পর্যন্ত খায়নি! একটা দানাও পেটে পড়েনি, শালা ঠাণ্ডায় দাঁতকপাটি লেগে যাচ্ছে তাও ঝুলে ছিলাম, এদের আড়ালে ছিলাম। ও রে আমার নদের চাঁদ, এই তো বসেছি বাপ হাঁটু গেঁড়ে, এইবার ঐ খেলনা রাইফেল থেকে টুস্ করে একটা সত্যি গুলি মেরে দাও, সত্যি সত্যি জীবনটা জুড়োক, বাবা আমার … ধন আমার … !
এই তিন চারজনের দলটার সম্বিৎ ফিরতে শেষপর্যন্ত দরজা ভেঙে ঢুকেছিল। তারপরে ডেকে নিয়েছিল সব্বাইকে। কচি মিলিটারিটা নেশায় বেশি করত বটে, তবে ছেলে চৌকশ ছিল। চিরকূটটা ওরই প্রথম নজরে আসে। চিরকূটের থেকে ওটাকে টিকিট বলাই ভালো। বিক্রি না হওয়া একটা পাতলা রঙিন খয়েরি রঙের টিকিটের পিছনে লেখা ‘ধ্যাৎ! মুরগি!’। ফোনে যোগাযোগ করা হয়েছিল ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে। চিরকূটটা পুড়িয়ে ফেলার নির্দেশ এসেছিল, আর বলা হয়েছিল একটা জাতীয় পতাকা কিনে বডিটা মুড়ে ফেলতে। পতাকা কারা বিক্রি করে, কতটা সস্তায় কারা ভালো দেয়—সবই জানা ছিল প্রত্যেকের, কিন্তু সমস্যা হলো ডিউটি। সমস্যা হলো, রুলস অ্যাণ্ড রেগুলেশনের, সমস্যা হলো সাংঘাতিক নেশা আর অভ্যেস।
শেষপর্যন্ত ঠিক হয়, আগে আপাতত কিছু একটা দিয়ে বডিটা মুড়ে ফেলা যাক। কারণ দুর্গন্ধ ছড়াতে শুরু করেছে। কিন্তু এই প্রস্তাবে সম্মতি মিললেও, ইয়েস স্যার সমস্বরে শোনা গেলেও অন্ধকারে বডি মুড়িয়ে রাখার মতো তেমন কিছু পাওয়া যাচ্ছিল না। ফিউজ উড়ে গেছে এ.সির জন্য। আর আলোও নেই। ফ্রিজ থেকে জল বের হয়ে হয়ে গোটা ঘরময় একটা বাসি সোঁদা গন্ধ। তার উপর আবার এই একটা মরা মুরগি। বহুক্ষণ ধরে নিজের ছাল নিজেই ছাড়িয়ে অবস্থাকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে যে। তারস্বরে বমি করতে করতে মাঝবয়সী, পেট মোটা এক মিলিটারি চিরে যাওয়া গলায় বলে উঠেছিল—“আগে ফিউজটা ঠিক কর শুয়োরের বাচ্চারা। বাপরে গন্ধ…!”
এত গন্ধ কোত্থেকে আসছে ঠাওর করতে পারছে না কেউ। আর সেটাই স্বাভাবিক। যে মুরগি ডিসেম্বরে মরেছে, অথচ চিরকূট লিখে প্রমাণ করে গেছে সে মানুষ, আর সামান্য মানুষ বলেই যাতে তার মৃত্যু সংবাদ খুব তাড়াতাড়ি লোককে ভাবিয়ে না তোলে সে জন্য এ.সি আর ফ্রিজ পর্যন্ত খোলা রেখে গেছে। মাত্র দেড়দিন পর এই ঘন শীতে তার বডি থেকে গন্ধ বেরনোর কোনো প্রশ্নই ওঠেনা। তবুও গন্ধের চোটে গড়গড় করে বমি করে গেছে এক মিলিটারি, নাকে রুমাল চাপা দিয়ে রেখেছে লাশ নামাতে আসা সব্বাই। চিক চ্যাক করে শুধু মাঝে মাঝে জ্বলে উঠছে লাল আর সবুজ লেজার লাইট। তাতে ঘরটাকে অনেকটা ডিস্কো থেকের মতো লাগছে।
এখানে চাকরি করতে আসার আগে সবাইকে দু’ সপ্তাহের একটা সাংঘাতিক ট্রেনিং পিরিয়ড পেরিয়ে আসতে হয়েছে। নিজেদের ধর্মমত মেনে সরকার সবাইকে দিয়ে নিজেদের পারলৌকিক কাজ করিয়ে নিয়েছে। কারণ সবাই জানত, কাজট খুব কঠিন, আর সেখানে ছুটি নেই। টাকা আছে, যতদিন ফ্যামিলি আর ফ্যামিলি তুতো লোকজন যতবেশি বেঁচে থাকবে, মাইনে সেই হারে বাড়বে। কিন্তু ফ্যামিলির লোকজনের সংখ্যা কমতে থাকলে মাইনে কমবে। আর এখান থেকে ফেরার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। সরকার শুধু টাকা দেবে। যাবতীয় দায়-দায়িত্ব তাদের নিজের প্রত্যেকের।
মুরগিটাকে শেষপর্যন্ত তাই তারা একচিলতে নোংরা খাটটায় শুয়ে রেখে সবাই মন দিয়েছিল ফিউজ সারাতে। জ্বলে উঠেছিল অনেকগুলো দেশলাই, জ্বলে উঠেছিল সিগারেট ধরানোর গ্যাসলাইট, জ্বলে জ্বলে উঠে নিভে যাচ্ছিল সবকটা। শুধুমাত্র লাল-সবুজ লেজার লাইটগুলো তাক করে শুষে নিচ্ছিল ফিউজটা। স্পার্ক হয়েছিল ফিউজটা সারানোর পর। চিরিক করে। ঘরময় আলো ছড়িয়ে পড়েছিল। সাদা কংকালের মতো রুক্ষ কিন্তু ধপধপে আলো। মড়া পোড়াতে যাওয়ার সময় যেভাবে কালো পিচ রাস্তার উপর ছড়িয়ে থাকে সাদা খই—সেরকম লাগছিল টিকিট কাউন্টারের বাইরে ছড়িয়ে থাকা গোটা এলাকার আলোগুলো।
নতুন বাতাসা আর পুরনো বিধবার শাড়ির মতো সেই ক্যাটক্যাটে আলোয় সবাই খুঁজে পায় একটা কালো রঙের রেনকোট। যে মুরগি মরেছিল, সম্ভবত এটা তারই। ডিসেম্বরে বৃষ্টি হয়না, হলেও তাতে রেনকোট প্রয়োজন পড়ে না। মুরগিটা ভেবেছিল আরও বহুদিন বাঁচবে। আশ্বস্ত ছিল সামনের বর্ষা সে দেখবেই। সে দেখবে তুর্কিনাচনের মতো বৃষ্টি কেমন মরা আগুন আর পুরনো ছাইয়ের ওপর ঠিক গুলির মতো বিঁধে যায়। মুরগিটা ভেবেছিল তখন রেনকোটটা লাগবে তার। বুলেটগ্রুফ বানিয়ে নিয়ে বৃষ্টির মধ্যে হেঁটে যাবে। টিকিট কাউন্টার বন্ধ করে দেবে। নতুবা ভেঙে ফেলবে হয়তো সে টিকিট কাউন্টারটা। লক্ষ লক্ষ টিকিটের পুরনো বস্তা ফেলে দেবে বৃষ্টিতে। ধুয়ে মুছে সাফ হয়ে যাবে সব। তারপর মুরগি বসাবে কড়াইয়ে। একটা মুরগি মেরে আর একটা মুরগি নেমন্তন্ন করে খাওয়াবে আর কয়েকটা মুরগিকে। মাস আটের অন্তঃসত্ত্বা এক মেয়ে মিলিটারি এসবই ভাবছিল।
টিকিট কাউন্টারের মিলিটারির সঙ্গে তার একটা অদ্ভূত সম্পর্ক তৈরি হয়েছিল। মেয়েটা আর সে একই দিনে চাকরিতে ঢুকেছিল। টিকিট কাউন্টারের মিলিটারিকে সে দাদা বলে ডাকত। আর টিকিট কাউন্টারের মিলিটারি তাকে বোন বলে ডাকতে ডাকতেই একদিন চেন খুলে ফেলেছিল নিজের প্যান্টের। তলপেট লক্ষ্য করে কষে বুট পায়ে একটা, জাস্ট একটাই লাথি ঝেড়েছিল মেয়েটা। কঁক করে বসে গেছিল দাদা মিলিটারিটা তাতে। খেলনা রাইফেলটা ছিটকে গেছিল দূরে। ক্যার ক্যার ক্যার করে ঝলসে উঠেছিল ৫ ফুট ৭ ইঞ্চির, ৬৬ কেজি ওজনের তুখোড় অ্যাথলিট বছর বাইশের মেয়ে মিলিটারির খেলনা ফর্টি সেভেন। চারদিকে থুতু ছেটাতে ছেটাতে চিৎকার করে মেয়ে মিলিটারিটা বলেছিল—“নিজের শ্রাদ্ধ নিজে করে তারপর এখানে এসেছি। ভূতের ইয়ে মারবি হারামি? … ওসব মানুষের কাজ…” সরকার এক্ষেত্রে সদর্থক ভূমিকা নিয়েছিল। প্রায় আধঘন্টার মধ্যেই সেবা শুশ্রূষার ব্যবস্থা করা হয় কেতরে পড়ে থাকা ভূতটার। আর তার কয়েক মিনিট বাদেই তীব্র নিন্দে জানিয়ে প্রেস বিবৃতি দিয়ে বসে কয়েকজন। মাঝখান থেকে বদলি করা হয়ে মেয়ে মিলিটারিটাকে। টিকিট কাউন্টার থেকে গাইড হিসেবে গাইডদের দেখাশোনা করার জন্য।
আর দেখাশোনা করতে করতেই দেখাশোনার প্রবল চাপে অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ে সে। সরকার টাকা পাঠায়, আর সরকারের বিজ্ঞানী নতুন থিয়োরি আবিষ্কার করে প্রমাণ করে— ‘গর্ভবতী হয়ে পড়া একরকমের অসুখ। এ থেকে বাঁচার জন্য চায় সুনির্দিষ্ট হাইজিন, সুষম খাবার ও যতদূর সম্ভব মেয়ে না হয়ে জন্মানো।’ ছোট ও মাঝারি কয়েকটি পুরষ্কারের পর বড়সড় একটি পুরষ্কারের দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে এখন বিজ্ঞানী। আর ৫ ফুট ৭ ইঞ্চির মেয়েটি, যার বর্তমান ওজন ৪২ কেজি, কোনো এক সময়ের তুখোড় অ্যাথলিট বছর ৩২-এর রুগ্ন-পেটসর্বস্ব মেয়ে মিলিটারির নজরে পড়ে রেনকোটটা।
ইশারায় সে বাকি সবাইকে রেনকোটটা দেখায়। ইশারা এই কারণে, কারণ অন্তঃসত্ত্বা হয়ে পড়ার মতো কঠিন অসুখে আর জিভ কেটে ফেলা হয়। তারপর রীতিমতো একমাস ফলমূলাদিসহ, একগুচ্ছ টেস্টসহ, কয়েকটি ছোট বড়ো অস্ত্রপ্রচার সহ তার ঠাঁই হয় নামী একটি নার্সিংহোমে। নার্সিংহোম থেকে ফেরার পর সে যোগ দেয় কাজে। এই ঘটনার অন্তত মাস পাঁচ আগে। আর ফিরতেই সে দেখেছিল এই কালো রেনকোটটা পরেই একটা মুরগি, যে আজ চেতরে হালকা একটু জিভ বের করে টানটান হয়ে খোলা চোখে চুপচাপ শুয়ে রয়েছে—ঘুরে বেড়াচ্ছিল টিকিট কাউন্টারের বাইরে। রোদে মেলা, অকস্মাৎ বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া জামা প্যান্ট তুলতে, ভ্যাপসা আর তীক্ষ্ণ দাবদাহের পর তুমুল বৃষ্টিতে দুজনের দেখা হয়েছিল। রেনকোট পরা মুরগি তলপেটে হাত দিয়েছিল নিজের রিফ্লেক্সে আর মেয়ে মিলিটারিটা দুর্বোধ্য হাসির সঙ্গে জানিয়েছিল স্যালুট! ভেজা জাঙিয়াটা নিংড়োতে নিংড়োতে কাঁধের উপর ফেলে রেখে রেনকোট পরা মুরগি মিলিটারি শুধু বলেছিল—“মামা আমি, অন্নপ্রাশন পর্যন্ত মালটা টিকে থাকলে ডাকিস।” বোবা, অর্থহীন চিৎকারে মেয়েটাও নিজের তলপেটে হাত দিয়েছিল শুধু। তারপর চলে গেছিল নিজের ডিউটির জায়গায়।
প্রচণ্ড নেশা সত্ত্বেও কচি মিলিটারি বাচ্চা বাচ্চা ছেলেটা ইশারাটা বুঝতে পারে। আর সঙ্গে সঙ্গে নাক থেকে রুমালটা সরিয়ে নিয়ে এক ঝটকায় নিঃশ্বাস বন্ধ করে রেনকোটটা হাতে নেয়, সঙ্গে সঙ্গেই সমস্ত ঘটনাগুলো ঘটতে থাকে। হুড়োহুড়ি পড়ে যায় রেনকোটটা পরানোর জন্য। ধাক্কাধাক্কি শুরু হয়। সবাই ভাবে মুরগিটাকে ঢেকে দিলে আর কোনো গন্ধ থাকবে না। ঝাঁপিয়ে পড়ে পাঁচ সাতজন মুরগিটাকে তোলে। ভকাভক হাত গলিয়ে দেয় রেনকোটে। পরিয়ে দেয়। আবার শুইয়ে দিয়ে বমি করতে থাকে কয়েকজন। এমনকী তুখোড় নেশাড়ুটাও, এমনকী ভুঁড়িওলা মিলিটারিটাও, এমনকী পূর্ণ গর্ভবতী জিভ ওপড়ানো মেয়ে মিলিটারিটাও। মেয়েটা বোঝে তার পেটের ভেতরে থাকা আধা মিলিটারি বা আধা মুরগি অথবা একটা হাফ বয়েল ডিমও বমি করতে শুরু করেছে ততক্ষণে। ছিটকে ছিটকে যে যেভাবে পারে কাচের ঘরটা থেকে বেরিয়ে যায়। শব্দনিরোধক সেই ঘর থেকে বাইরে এসেই তারা যোগাযোগ করে ঊর্ধতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে।
ফোন বেজে যায়। যেমন মধ্যরাত্রে জন্মানো শিশু চিৎকার না করলে পোঁদে চাপড় মারে সুন্দরী নার্স, আর গোঙাতে গোঙাতে প্রথম কান্না কেঁদে নেয় নবজাতক। ভবিষ্যৎবাণী হয়, এই সন্তান এখন সংবিধান স্বীকৃত। দেশের জন্য, দশের জন্য, লক্ষ লক্ষ মানুষের আর মুরগির জন্য তার জীবন এখন থেকেই উৎসর্গীকৃত। সন্তানটির পোঁদ, পিঠ, বুক, কাঁধ, লিঙ্গ, হাত-পা সমস্ত কিছুই সংবিধানের জন্য বলিপ্রদত্ত। দেশে সংখ্যা বাড়ে একজনের। মুরগির রাজত্বে মায়ের পাতে হাফ বয়েল ডিম অথবা চিকেন স্টু অথবা উদ্দাম কেলানি আর খিস্তি জোটে। যেমন এবার, ফোন বেজে যাওয়া সত্ত্বেও, শিশুর মতো ফোন কেঁদে যাওয়া সত্ত্বেও কেউ তাকে ধরছে না, থামাচ্ছেনা। আহারে বাবু নুঙ্কুপুঙ্কু, মন্টুসোনা, কুচি মুচি করে খেলনা রাইফেল আর মিলিটারি পোশাক পরা মুরগিগুলোর ফোন কেউ ধরছে না। সরকার ধরছে না। মন্ত্রী ধরছে না। আমলা ধরছে না। ক্লাবের প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত—না। ঘেউ ঘেউ করে বেজেই যাচ্ছে ফোন। মিলিটারিগুলো বোঝে, সাংঘাতিক মুরগি হয়েছে তারা। ভোর ফুটতে শুরু করেছে ততক্ষণে। চাঁদের আলো মরে গেছে। হাফ বয়েল কুসুমের মতো গগন ঠাপিয়ে দিচ্ছে সূর্য।
আর গন্ধ বাড়ছে। অদ্ভূত গন্ধ। মেয়ে মিলিটারিটা বমি করতে করতে শুয়ে পড়েছে পা ফাঁক করে। তার স্মৃতি ফিরে আসছে। খুলে ফেলছে প্যান্ট, অন্তর্বাস। জিভ কাটা সত্ত্বেও তার স্পষ্ট উচ্চারণে আটকে আটকে যাচ্ছে সমস্ত চারপাশ। হাফ বয়েল কুসুমের মতো তুলতুলে সূর্য পকাৎ করে ঢুকে গেল মেঘের ধোঁয়ায়। গন্ধটা তীব্র হচ্ছে। ফের অন্ধকার হয়ে আসছে চারিপাশ। আবৃত্তির সুরে, পা ফাঁক করে, নিজের যোনির কাছে আঙুল রেখে মন্দ্র আহ্বানে মেয়ে মিলিটারি ডাকছে বাকিদের। কেউ এগোতে সাহস পাচ্ছে না। লাল-সবুজ লেজার জ্বালিয়ে তাক করে রেখেছে মেয়ে মিলিটারিটার মাথায়, গলায়, বুকে, পেটে, যোনিতে … ফায়ারিং স্টার্ট হলো শেষপর্যন্ত।
ট্যারাট্টর, ট্যারাট্টর, ট্যারাট্টর করে খেলনা বন্দুক থেকে সত্যি সত্যি গুলি ছিটকোতে শুরু করেছে ততক্ষণে। গন্ধটা তীব্র হচ্ছে। আকাশ ফাটিয়ে নামছে বৃষ্টি। যেমন বোমারু বিমান থেকে নেমে পড়ে সন্দেশ, মিঠাই অভুক্তের পাতে। লাল, ঘন লাল চ্যাটচেটে গরম রক্ত ধুয়ে যাচ্ছে। ফায়ারিং করতে করতে ক্লান্ত লাগছে এবার।
ডিসেম্বরে এত বৃষ্টি সচরাচর হয়না। তবে আজ আর ডিসেম্বর নেই। ৩১ শে ডিসেম্বরের পর পয়লা জানুয়ারি আজ। ১৬ বছর পর ফের যুদ্ধ লেগেছে জঙ্গলে। ছাইয়ের পর ছাই হয়ে যাচ্ছে চারিপাশ। মরা আগুন জ্যান্ত হয়ে পড়েছে ফের। যাকে পারছে ছুঁয়ে দিচ্ছে। খেলা চলছে যেন। আর সেই খেলার মাঝেই মেয়ে মিলিটারির যোনি থেকে বেরিয়ে পড়ছে একটা শিশু। বেরিয়ে পড়ছে আস্ত একটা মুরগি। ওকে অন্নপ্রাশনে মাছের মুড়ো হাতে ধরানো হবে, যদি বেঁচে থাকে। তারপরেও যদি বেঁচে থাকে ওর পাঁচবছরের জন্মদিনে দেওয়া হবে খেলনা রাইফেল। আর বহুবছর পর সেই খেলনা রাইফেল থেকে সত্যি সত্যি গুলি বেরোতেই পারে। কাজেই ওকে এখনই হেরিটেজ ঘোষণা করা হোক। ওকে টিকিট কেটে দেখতে আসুক সব্বাই। ততক্ষণ পর্যন্ত গন্ধটা বাড়তে থাকুক। ততক্ষণ পর্যন্ত গন্ধটা বাড়তে থাকুক। ততক্ষণ পর্যন্ত গন্ধটা বাড়তে থাকুক।
[গল্পটি 'বিরাট কোহলির পাড়া ও অন্যান্য গল্প' বইটি থেকে সংগৃহীত]
গল্প সংগ্রহ: বিরাট কোহলির পাড়া ও অন্যান্য গল্প
ব্রজ সৌরভ চট্টোপাধ্যাযইয়ের ১৪ টি গল্পের সংগ্রহ
প্রাপ্তিস্থান
কলেজস্ট্রিট: প্রতিক্ষণ, দে বুকস্টোর (দীপু), দে'জ, প্ল্যাটফর্ম, ধ্যানবিন্দু, বৈভাষিক, গল্পগুচ্ছ।
সোদপুর: পাপাঙ্গুল ঘর।
শ্রীরামপুর: Vestpocket
শান্তিনিকেতন: রামকৃষ্ণ বুক স্টোর, সুবর্ণরেখা, বইঘর শান্তিনিকেতন।
বর্ধমান: নবনী বুকস্টল
অনলাইন: https://amzn.in/d/0baiWksm