মিডলফিঙ্গার
বিবস্বান ঘোষাল
ল্যাম্পপোস্টের মৃদু আলোয় গা সেঁকছিল ভাঙাচোরা দেওয়ালটা। পাশ দিয়ে চলে গেছে একটা এঁদো রাস্তা। আরেকটু এগোলে একটা মোড় ঘুরে, হ্যাঁ, ওখানটাতেই ল্যাবার বাড়ি। বাড়ির সামনের ন্যাড়া উঠোনটায় মড়া আরশোলার মতো উল্টে পড়ে আছে একটা আখ মাড়াই মেশিন। উঠোনের একদিকে এক কামড়ার একটা ঘর। তার এক কোণায় একটা বিছানা, আরেকদিকে রান্নার সরঞ্জাম। টিমটিমে একটা টিউব ঘরের অন্ধকার আরও বাড়িয়ে তুলেছে। ঘর থেকে বেরিয়ে একটা ধাপ সিঁড়ি নেমে, একটু দূরে একটা একটা জং-ধরা দরজা, তার নিচের দিকটার লোহা ক্ষয়ে গেছে। দরজার ওদিকে চান ঘর। এদিকে ঘুপচি ঘরে বুকচেপে শুয়ে থাকা ল্যাবা। মাথাটা বা দিকে ঘোরানো। ঘট-ঘট শব্দে পাখা ঘুরছে।
— কত করে?
— পনেরো… বিশ …
—এদিকে একটু তাড়াতাড়ি…
ঝন ঝন ঝন ঝন।
চাকা ঘুরছে। রসালো আখ মেশিনের পাকস্থলী থেকে কাঠ ছিবড়ে হয়ে বেরিয়ে আসছে।
ঝন ঝন ঝন ঝন।
রসালো আখ মেশিনে ঢুকে ছিবড়ে হয়ে বেরিয়ে আসছে।
ল্যাবার বাঁ-হাতের কব্জি থেকে মধ্যমা চুঁইয়ে রক্ত মাটিতে জমাট বাঁধছে। কামড়ানো দাঁত থেকে খসে পড়েছে ব্লেডটা। চোখ খোলা, দৃষ্টি নেই। ডাক্তারিবিদ্যে বলে মানুষ মারা যাবার পর আট ঘন্টা পর্যন্ত চোখ সক্রিয় থাকে।
কি দেখছে ও? কি দেখতে চাইছে?
ল্যাবা ছোট থেকেই দুর্বল। বাবা ক্যান্সারে মরে গেল যেদিন,সামনের উঠোনটায় ভরা লোক। স্যান্ডো গেঞ্জি আর হাফ প্যান্ট পরা ল্যাবা সবটা বুঝে ওঠার আগেই শেষ। বাবার পরই মা, ও তখন ষোল।
তারপর অনেক কথা। খোলা চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা জল পরলো কি?
একটা লোহার দানবকে প্রাণ দিয়ে ছেড়ে দিলে কেমন হয়? সেটা যখন গোঁ গোঁ শব্দে ছুটে আসে চাঁদের আলো ভেদ করে, কবিতা লেখা যায় না বলেই বোধ হয়। দানবটা হাত দিয়ে ঠেলে দেয় মানবিকতা বা সেই মহার্ঘ্য কিছু যার জোরে মানুষ আর যেকোনো ইতর প্রাণী আলাদা। ঠেলে দেওয়ার পর শরীরে হাত মিশিয়ে নেবার অছিলায় দানবটা বুকে টেনে নেয় ঘৃনা, একরাশ ঘৃণা।
ঝন ঝন ঝন ঝন নয়।
ঘড় ঘড় ঘড় ঘড়—গোঁ গোঁ গোঁ গোঁ।
দানব আসছে।
ল্যাবা কিন্তু দেখতে পাচ্ছে। সব দেখতে পাচ্ছে, মজা দেখছে ও।
—হাত ভালো তো?
ঝন ঝন ঝন ঝন।
—আখ কেন কোত্থেকে?
—নানা জায়গা বাবু, মহাজনের মেশিন।
—ধরতে অসুবিধে হয়না?
—অভ্যেস হয়ে গেছে। ছোট বেলা থেকেই তো... হুম... এই নিন।
জন্মগতভাবে কারো কারো একটু খুঁত থেকে যায়। কারো উচ্চতা অতিরিক্ত বেশি, বা অতিরিক্ত কম, পা একটু খোড়া, নাকের কাছে বিরাট আঁচিল। ল্যাবার ছিল কমতি, তার দুটো হাতেরই শেষ দুটো আঙ্গুল নেই। তিন তিন ছয় আঙুলে যতটুকু টাকা ধরে সবটা নিজের ছেড়া বুক পকেটে জমাতে চাইতো ল্যাবা। বেশির ভাগই পারত না। যেটুকু পারতো হয় আঙুল গলে, বা বুকপকেটের ফাঁক দিয়ে বেরিয়ে যেত। পকেট থেকে আজাদ হয়ে নিস্প্রাণ টাকাগুলোই যেন জীবন্ত হয়ে চালাতে শুরু করতো ল্যাবাকে, দানবটাকে, সকলকে।
ইস্কুলের পাট চুকিয়ে কলকাতার কাঠ চেরাই কলে চলে গেছিল ল্যাবা।
টেবিল চেয়ার খাট, সব— সব। পয়সা নেহাত মন্দ নয়। কিন্তু অসাবধানে করাত মেশিনে বাঁ হাতের বুড়ো আঙ্গুল আর তর্জনীটা গেল। মালিকই বা এরম কাউকে পুষবে কেন? অতএব লাথি।
দমদম স্টেশনের বাইরে আখের রসের দোকানটা কোনোরকমে পেয়েছিল ল্যাবা। দিনে আড়াইশো টাকা হপ্তা। একবার ভেবেছিল ও, পারবে কি? যাবেইবা কোথায়….কোন জায়গায় না পয়সা ছাড়া কাজ হতে দেখেছে আজ অব্দি ।
বাবার খবরটা শোনার পর মা তখন পাথর। হাসপাতালের বাইরে একটা বেঞ্চিতে ল্যাবার শুকনোমুখ, রোগা চেহারার, গাল বসা মা একটাই কথা বলেছিল— এবার কি হবে?
বাবার চলে যাওয়া-টা না ভবিষ্যতের ভাবনা কোনটা বেশি কষ্টের সেই হিসেব সেদিন ল্যাবার মাথায় ঢোকেনি। শুধু মনে আছে, পল্টন কাকু শুকনো গলায় এসে বলেছিল— বাবা , দেখনা একটু, ...টাকা জমা না করলে , বডি দেবেনা বলছে। কিছুমাত্র না বুঝেও, মায়ের কানের দুল জোড়া দিয়ে বাবার বডিটা কিনে ফেলেছিল ল্যাবা।
দোকানটা থেকে আয় খুব ভাল না হলেও, মোটামুটি চলে যেতো ল্যাবার। সবে হাল একটু একটু ফিরতে শুরু করেছে, বাড়িটা একবার রঙ করাবে ভাবতে ভাবতেই মাও চলে গেল। ও ভেবেছিল, এ একরকম মন্দ নয়। একার চলতে বিশেষ সমস্যা হবে না এই আয়েও।
শিবানী মাসি প্রথম লাশটা দেখেছিল ল্যাবার। তারপর যা হয়। হাঁকডাক , চিৎকার। পুলিশ এল। ওর কিন্তু বেশ মজাই লাগছিল। বেশ একটা সাদা চাদর। ও আজ প্রথমবার গাড়ি চড়বে। হুটার বাজিয়ে ছুটবে গাড়িটা। রাস্তা ছেড়ে দিতে বাধ্য সকলে।
বিরাটকায় হলুদ লোহার দানব। লোহার হাত, লোহার হাতের পাতা।
গোঁ গোঁ গোঁ গোঁ...
ঘড় ঘড় ঘড় ঘড়।
শোনা যাচ্ছিল যে সমস্ত দোকান হয়তো ভাঙ্গা পড়বে। রাস্তা চওড়া হবে আরও বড় বড় গাড়ি যাবে। বিদেশের মতো একদম। ল্যাবা অবশ্য জানেনা বিদেশটা কোনদিকে। সেখানে সবই বড়ো বড়ো কিনা। ওর শুধু ক্লাস ফোরের বাংলা ক্লাসের ভূপতি বাবুর কথা মনে পড়ছিল, —অন্যায় যে করে, আর অন্যায় যে সহে… মানে… যে খারাপ কাজ করছে আর যে তার ভাগীদার , দুইই সমান অপরাধী। ও, আসে পাশের সমস্ত দোকানদাররা… নিশীথ বাবু, বুল্টাই, মিঠুদি, সবাই, সবাই যদি দোষী হয় তবে যে বাবুরা দোকান থেকে জিনিস কিনেছে, খাবার খেয়েছে, তারা অন্যায় করেনি? তাদেরই গাড়ি চলবে? ওদের কিছু হবেনা? কেন কেন? কেন?
ল্যাবা কিছু বুঝতে পারেনা। প্রচণ্ড বিপদে মানুষ নিজের জীবন নিয়ে ভাবে সবচেয়ে বেশী। ল্যাবাও অঙ্ক বুঝতে চায়, এবার কার বডি কিনতে হবে ওকে? আর কিসের বিনিময়ে, সেইটা আরও দরকারি।
নিজের ঘরে ঘুমিয়েছিল ল্যাবা। প্রচণ্ড চিৎকার চেঁচামেচিতে ঘুম থেকে উঠে গোড়ায় কিছু ধরতে পারেনি ও। এক ছুটে বেরিয়ে মোড়টা ঘুরে দৌড়তে দৌড়তে যতোক্ষণে গিয়ে পৌঁছল, শ-য়ে শ-য়ে লোক জমে গেছে ততক্ষণে। দুটো বিরাট হেডলাইট আগুনের মতো জ্বলছে।
বিপ বিপ বি...
ঘড় ঘড় ঘড় ঘড়...
গোঁ গোঁ গোঁ গ...
চোখের সামনে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে সবকিছু। ডান হাতের পাতা দিয়ে ঝাপসা চোখ মুছতে মুছতেই ল্যাবা বুঝল ওকে ঘিরে ধরছে ধ্বংসস্তূপ। দম আটকে আসছে। হঠাত সাঙ্ঘাতিক একটা অন্ধরাগ হয় ল্যাবার। ঝাপিয়ে পড়তে চাইলো দানবিক স্ট্রাকচারটার সামনে। অমনি চারদিকের চিৎকার বেড়ে গেলই যেন বহুগুণে। ও অনুভব করল ডানহাতের বুড়ো আঙ্গুল আর তর্জনীটায় অসহ্য যন্ত্রনা হচ্ছে। কে একটা পিছনে টেনে নিল ওকে।
একটু ধাতস্থ হতে বোঝা গেলো এলোপাথারি লাঠিচার্জ ল্যাবার আঙ্গুল দুটো জন্মের মতো ভেঙে দিয়েছে। আর ভেঙে দিয়েছে ওর মন, বেঁচে থাকার ইচ্ছে। হাসপাতালে গিয়ে কোনোক্রমে আঙ্গুল দুটো প্লাস্টার করা হলো। কারুর ফাটলো মাথা, কান, রক্তে লাল জামা পড়ে চললো ময়দান মেপে নেওয়া।
ল্যাবা জানে ওদের আজটা নিয়ে আনন্দ করতে নেই। সোনার হরিণের মতো কালটাকে ধাওয়া করে যাওয়াই ওদের আজ। সবথেকে বড়ো হলো— অপমান। টিভির রিপোর্টাররা বলল শুধু— এত সংখ্যক আহত, এত জনের অবস্থা সঙ্কটজনক। নাম নেই। কেন এই অবস্থা হল, তার ইতিহাস নেই। তাই ভবিষ্যতও নেই।
মাথাটা ঝিম ঝিম করে ল্যাবার। কেমন একটা ঘোরের মধ্যে হাসপাতাল চত্বরে বসে থাকে ও, ডানহাতে প্লাস্টার লাগিয়ে। সব ভাঙল। সব শেষ। কিন্তু গাড়িটা যে চালাচ্ছিল সেই ছেলেটা ওরম ছলছলে চোখে তাকাচ্ছিল কেন? চোখটা একটু উজ্জ্বল হয় ল্যাবার। তারমানে এখনো উপায় আছে। একসাথে হতে হবে, একসাথ...
কাগজে কাগজে ভাঙ্গা টিনের শেড, ত্রিপল, বাখারির ছবি। ফোনে, টিভিতে নেতাদের মতামত।
—ওদের আসলে অনেক টাকা, আমি বলছি আপনাকে…
ল্যাবা মনে মনে বলে,— শালা বেজন্মা,...এতই যদি টাকা আমাদের তো নিজের ছেলেকে রাস্তায় দোকান খুলে দিলিনা কেন...
পরের দিন দেখা গেলো এক আশ্চর্য দৃশ্য। ধ্বংসস্তুপের মাঝখানে কান্না হাপরের মতো ঠেলে উঠছে। বড়ো বড়ো মানুষের রগরগে লেকচারে কান পাতা দায়। এই সবকে ছাপিয়ে সবার দৃষ্টি যাচ্ছে একটা পাগলাটে খোঁচা দাড়ি ছেঁড়া জামা লোকের দিকে।
সে ক্রমাগত চিৎকার করছে নিজের ন্যাড়া মুঠোটার ওপর জেগে থাকা মরূদ্যানের মত মধ্যমা দেখিয়ে বলছে— ত্তোদের আমি মানি না, ভয় পেয়েছি ভাবছিস, এই দাখ… থোড়াই কেয়ার…! কত ভাঙবি… ভাঙ… আমি… এই আমি… আমরা আছি, ছিলাম থাকব। দ্যাখ তোরা… সব গেছে আমার… জীবন… উপার্জন… কিছু হারানোর নেই। এবার সব ছিনিয়ে নেবার পালা… এই দ্যাখ…
একটা খুঁতো ছোটলোক, সরকারি ডিসিশনকে হেলায় মিডল ফিঙ্গার দেখাচ্ছে এটা নিয়ে হইচই হলেও ভাল ভাবে যে কেউ নেবে না এটা সবাই জানত। ল্যাবাও কিন্তু তাও যখন বিশুর দকান থেকে ব্লেড কিনল ল্যাবা কেউ সন্দেহ করেনি। এখন আবহাওয়া গুমড়ে আছে। নইলে হয়ত মাকুন্দ বলে পেছনে লাগত লোকে।
পেটচেপে শুয়ে দাঁতে ব্লেড কামড়ানর মুহূর্তে ওই ছলছলে চোখের ছেলেটার মুখটা ভেসে উঠেছিল। আলগা হেসেছিল ল্যাবা। সামনের জন মাটিতে পড়ে যাবে, পেছনের জন তার জায়গা দখল করবে। ছেলেবেলায় ফুটবল খেলার কথা মনে পড়ল ওর। সবাই খেললেও ওর জুটত সাইডলাইনে বল কুড়োনো। তখন খারাপ লাগত। আজ স্বেচ্ছায় ওই ছেলেটাকে জায়গা ছেড়ে দিতে চাইল ল্যাবা। কামড়ানো ব্লেডটার দিকে হাতটা এগিয়ে আসে ল্যাবার।
এইবার কাগজে নাম এসেছে ল্যাবার। মিডিয়ায় ভরতি উঠোনটা। গোটা নাম নিউজে। লাল্টু দাস। নানা লোকের নানা থিওরি নামাচ্ছে। সার্কাস দেখছে ল্যাবা। সত্যিটা জানার পর মিথ্যে শুনলে যেমন মজা লাগে, তেমনি। বাহ, এইতো চমৎকার এসি গাড়ি। চারদিকের ভাঙাচোরা জিনিস দুপাশে ইতিহাসের মতো ফেলে রেখে এগিয়ে যাচ্ছে ল্যাবার বাহন। এহ, ককী রগড়! কাউন্সিলার মালা দিতে আসছে। সব দেখছে ল্যাবা। মৃত্যুর পরেও আট ঘণ্টা চোখ সক্রিয় থাকে।
রাস্তার ধারে পার্ক করা জেসিবিটাকে চাদরের নীচ থেকেই মিডল ফিঙ্গার দেখাতে দেখাতে ল্যাবা অদৃশ্য হয়ে গেল।