হাংরি জেনারেশন আন্দোলন
সব্যসাচী সেন
গত শতাব্দীর ষাটের দশকের শুরুতে সম্ভবত ১৯৬১-৬২ সাল নাগাদ সুভাষ ঘোষ ও বিশ্বনাথ ঘোষ সম্পাদনা করতেন 'এষণা' পত্রিকা। পত্রিকাটি প্রকাশিত হত ১৬ বি, শ্যামাচরণ মুখার্জি স্ট্রিট থেকে... স্থানটি একেবারে টালার কাছে। এখান থেকেই সুভাষ ঘোষ ও শৈলেশ্বর ঘোষ ১৯৬৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর গ্রেপ্তার হন। ৪ঠা সেপ্টেম্বর পাটনা থেকে মলয় রায়চৌধুরীকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর একে একে গ্রেপ্তার হন সমীর রায়চৌধুরী, প্রদীপ চৌধুরী, দেবী রায়। এই অভিযোগে উৎপলকুমার বসু, সুবিমল বসাক, বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুবো আচার্য প্রমুখের বিরুদ্ধে ওয়ারেন্ট ইস্যু থাকলেও তাঁদের গ্রেপ্তার করা হয়নি।
হাংরি আন্দোলনের উত্থানের সঙ্গে জড়িয়ে আছে 'এষণা' পত্রিকাটি। চারটি সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল। 'এষণা'য় কে না লিখেছেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়, উৎপলকুমার বসু, সমীর রায়চৌধুরী, মলয় রায়চৌধুরী, শৈলেশ্বর ঘোষ, সুভাষ ঘোষ ও আরও অনেকে।
১৯৬২ সালে হাংরি জেনারেশন সাহিত্য আন্দোলনের সূচনা। এ আন্দোলনের স্রষ্টা ছিলেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। টাইম ম্যাগাজিনের রিপোর্টে ১৯৬২ সনকেই আন্দোলনের সূচনা হিসেবে ধরা হয়েছে: "Born in 1962, with an inspi-rational assist from visiting U.S. Beatnik Allen Ginsberg, Calcutta's Hungry Generation is a growing, band of young with tigers in their tanks." (TIME MAGAZINE, 20 Nov. 1964) কিন্তু সচেতনভাবে গণ্ডগোল পাকিয়েছেন মলয় রায়চৌধুরী। সচেতনভাবে বলছি এই কারণে- ১৯৬২ সালেই প্রথম হাংরি জেনারেশন বিষয়ক রচনাটি লেখেন শক্তি চট্টোপাধ্যায়। এখানে যদি ১৯৬২ সালের বদলে ১৯৬১ সাল করা যায়, তবে শক্তির ১৯৬২ সালে প্রকাশিত হাংরি জেনারেশন বিষয়ক রচনাটি অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যায়। তাহলে মলয় রায়চৌধুরীর নিজেকে 'হাংরি আন্দোলনের স্রষ্টা' ব'লে প্রমাণ করতে সুবিধা হয়। কিন্তু মলয় রায়চৌধুরী যে ম্যানিফেস্টোটি দেখিয়ে প্রমাণ করার চেষ্টা করেছেন যে হাংরি আন্দোলন ১৯৬১ সনের নভেম্বর মাসে শুরু হয়, তাতে কোনো সন-তারিখের উল্লেখ ছিল না। আর সাহিত্যের গবেষক মাত্র জানেন যে, কোনো পত্রিকা প্রকাশকালে তার সন-তারিখ অবশ্যই উল্লেখ থাকা বাঞ্ছনীয়।
শক্তি চট্টোপাধ্যায় সম্প্রতি পত্রিকায় বিনয় মজুমদারের একটি কাব্যগ্রন্থের আলোচনা করতে গিয়ে লিখলেন হাংরি জেনারেশন সম্পর্কে কিছু কথা। সেটা ১৯৬২ সাল। সেসময় শক্তির হাংরি জেনারেশনে যোগ দিয়েছিলেন উৎপলকুমার বসু, বাসুদেব দাশগুপ্ত, দেবী রায়, মলয় রায়চৌধুরী, সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় প্রমুখ। প্রথমপর্বের হাংরি সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় 'এষণা' পত্রিকায় লিখেছেন-
'শক্তি চট্টোপাধ্যায় পরিচালিত হাংরি জেনারেশনের কোনো মুখপত্র নেই-বস্তুত হাংরি জেনারেশন একটা আইডিয়া- যার বিষয়ে শক্তি একটি গ্রন্থ সমালোচনা করতে গিয়ে প্রথম কিছু লেখে। প্রয়োজনবোধে সেই লেখা থেকে একটু দীর্ঘ উদ্ধৃত দিচ্ছি: 'বিদেশে সাহিত্য কেন্দ্রে যে-সব বর্তমান হচ্ছে, কোনটি বীট জেনারেশন, কোনটি অ্যাংরী বা সোবিয়েত রাশিয়াতেও সমপর্যায়ী আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে যদি বাঙলাদেশেও কোনো অনুক্ত বা অপরিস্কার আন্দোলন ঘটে গিয়ে থাকে তবে তা আমাদের রাষ্ট্রনৈতিক বা সামাজিক পরিবেশে 'ক্ষুধা সংক্রান্ত' আন্দোলনই হওয়া সম্ভব। ওদিকে ওদেশে সামাজিক অবস্থা এ্যাফ্লুয়েন্ট, ওরা বীট বা অ্যাংরী হতে পারে। আমরা কিন্তু ক্ষুধার্ত। যে-কোনো রূপের বা রসের ক্ষুধাই একে বলতে হবে। কোনো রূপ বা কোনো রসই এতে বাদ নেই, বাদ দেওয়া সম্ভব নয়। একে যদি বীট বা এ্যাংরি দ্বারা প্রভাবিত বলার চেষ্টা হয় তবে ভুল বলা হবে। কারণ এ আন্দোলনের মূল কথা 'সর্বগ্রাস'। অর্থাৎ ভাত-ডাল-চিংড়ি মাছের চচ্চড়ির সঙ্গে এই আন্দোলন বীট জেনারেশন সমেত মেখে লঙ্কা ও নিমকের টাকনা দিয়ে গ্রাস করতে চায়। বদহজম-সংক্রান্ত কথা উত্থাপিত হবে না আশা করি। কারণ বদহজমই হলো শিল্প। জীবন চিবিয়ে যতটুকু অখাদ্য তার বমনই হলো গদ্য, পদ্য, ছবি ইত্যাদি। গু-গোবরের সামিল।... এই ক্ষুধার্তদের কেউ কেউ লিঙ্গ প্রহার করে দেখবেন হৃদয়ের যতদূর অধিষ্ঠান লিঙ্গ ততদূর যায় কিনা কিংবা এক কথায় উক্ত অঙ্গ হৃদয়কেই স্পর্শ করে কিনা..."
"শক্তি খুবই অন্যমনস্ক বা অপ্রাসঙ্গিকভাবে কথাগুলি লেখেন, আমরা বন্ধুরা কেউই জানতাম না শক্তি এ-রকম ভাবছে, কিন্তু ঐ নিয়ে তুমুল আলোচনা শুরু হয়ে যায়। সুতৃপ্তি রেস্তরায়, পত্র-পত্রিকায় ও কফি হাউসে। হাংরি জেনারেশন নামক আন্দোলন শুরু হয়ে যায়। পাটনা থেকে মলয় রায়চৌধুরী নামক এক অজ্ঞাত যুবক এর কিছুদিন নেতৃত্ব করেন। কিন্তু হাংরি জেনারেশন এমন এক জিনিস যে কারো হাতেই নেতৃত্ব বেশিদিন থাকে না।" (নিজের ও বন্ধু বান্ধবের বিজ্ঞাপন- সন্দীপন চট্টোপাধ্যায়, এষণা, সম্পাদনা: সুভাষ ঘোষ, অগ্রহায়ণ সংকলন-১৩৭০ পৃ.২৫-২৬)
শক্তি চট্টোপাধ্যায় ও সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় দুজনে মিলে ১৯৬৪ সালের আগস্ট মাসে 'হাংরি জেনারেশন' নাম দিয়ে একটি পত্রিকা প্রকাশ করেন। পত্রিকার পেছনে লেখা ছিল- "শ্রী সন্দীপন চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক ১১৭/১ দমদম রোড, কলি-৩২ হইতে পরিকল্পিত এবং শক্তি চট্টোপাধ্যায় কর্তৃক ৪, অধর দাস লেন, কলিকাতা-৪ হইতে প্রকাশিত।" ব্যাক কভার পেইজে লেখা ছিল- "ক্ষুৎকাতর সংকলন, আটান্ন, অগাস্ট ১৯৬৪।"
১৯৬৪ সালের ১৬ পাতার যে 'হাংরি জেনারেশন' সংকলনটি নিয়ে রাষ্ট্রদ্রোহিতার অভিযোগ সেটিতে কোনো সন তারিখের উল্লেখ ছিল না। তবে এই গ্রেপ্তারের তারিখটি থেকে বোঝা যায় এটি ১৯৬৪ সালের আগস্ট সেপ্টেম্বরেই প্রকাশিত হয়। এটির প্রকাশক হিসেবে সমীর রায়চৌধুরীর নাম ছিল: Published by Sri Samir Roychoudhury from 48A, Sankar Haldar Lane, (Ahiritola) Calcutta (India) on behalf of HUNGRY GENERATION.
কিন্তু সমীরবাবু অস্বীকার করে পুলিশের কাছে বলেন যে, তিনি এটির প্রকাশক নন: "I have been alleged to be publisher of leaflet which is said to be containing obscene articles, but in fact I have not published them neither I have seen any of the articles prior to publication of the leaflet in question." (হাংরি জেনারেশন আন্দোলন-শৈলেশ্বর ঘোষ/বাসুদেব দাশগুপ্তের সংযোজন, জানুয়ারি ১৯৯৫, পৃ. ১১৮)। এবং মলয়বাবুও তাঁর রচিত 'হাংরি কিংবদন্তী' গ্রন্থে স্বীকার করেছেন, "সমীর রায়চৌধুরী প্রকাশনার কথা অস্বীকার করে।” (হাংরি কিংবদন্তী, প্রথম প্রকাশ জুলাই ১৯৯৪, প্রকাশক, দে বুক স্টোর, পৃ. ৬৩) মলয় রায়চৌধুরী দাবী করেন যে তিনি হাংরি জেনারেশন আন্দোলন শুরু করেছিলেন। কিন্তু আদালতে মামলা চলাকালীন শক্তি চট্টেপাধ্যায় বলেছিলেন- "It is a fact that this literay movement (Hungry Generation) was strated by me with some other friends." আমরা যারা দীর্ঘদিন ধরে হাংরি নিয়ে চর্চা করছি তারা সকলেই জানি যে এই আন্দোলন শক্তি চট্টোপাধ্যায় শুরু করেছিলেন। বিতর্কিত এই সংকলনটি নিয়ে কয়েকজন আন্দোলনকারীর গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য যা আমি জানি, তা হল এই:
(১) হাংরি আন্দোলনের দ্বিতীয় পর্যায়ের কথা সুভাষ ঘোষের একটি বক্তব্য
জানা যাচ্ছে- "তখন হাংরি আন্দোলনের প্রথম পর্ব শেষ... শেষ পর্বে ঝাঁকের কই মিশে গ্যাছে ঝাঁকে- আমাদের নিয়ে '৬৩-'৬৪-তে আরম্ভ দ্বিতীয় পর্বের- 'হাংরি জেনারেশন' এক ফর্মার যে সংখ্যাটি নিয়ে মামলা মোকদ্দমা সেটি কলকাতা বের করার তোড়জোড় চলছে। মলয় তখন পাটনায়।" (সুভাষ ঘোষ এবং একটি সাক্ষাৎকার/সমবেত আর্তনাদ, চতুর্থ সংখ্যা- জানুয়ারি-এপ্রিল ১৯৮৯, পৃ.২৬) সুবিমল বসাকের মারফত এই সংখ্যায় মলয়ের লেখা নেওয়া হয়।
(২) সুভাষ ঘোষ আরো জানাচ্ছেন- "প্রদীপের চেনাজানা খুব গরীব চেহারার প্রেসে ছাপা হয় 'হাংরি জেনারেশন'- প্রেসে ছাপার দায়িত্ব আমার, প্রদীপ ও শৈলেশ্বরের। ছাপার পর সংখ্যাটি কলকাতায় আমি ও প্রদীপ ব্যাপকভাবে প্রচার ও বিলি করি, শৈলেশ্বরও আমাদের সঙ্গে ওই কাজে যোগ দেয়। কফিহাউস, প্রেসিডেন্সি কলেজ, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়, যাদবপুর, রবীন্দ্রভারতী কিছুই বাদ যায় না। তখনকার অনেক উঠতি লেখক সংখ্যাটি নিতে রিফিউজ করে- এরপর যা ঘটার তাই ঘটে। প্রতিষ্ঠানের তাবৎ মাতব্বর ও দালালেরা নষ্ট সতীত্ব উদ্ধারে তৎপর হয়- তৎপর হয়ে ওঠে রাষ্ট্রের মাতব্বর পুলিশ- আমি ও শৈলেশ্বর গ্রেপ্তার হই প্রথম এবং কলকাতায়।' (সুভাষ ঘোষ ও একটি সাক্ষাৎকার- সমবেত আর্তনাদ, চতুর্থ সংখ্যা, জানুয়ারি-এপ্রিল ১৯৮৯, পৃ. ২৬-২৭)
(৩) প্রাবন্ধিক ও গদ্যকার অজিত রায় লিখেছেন, 'এরা প্রত্যেকে ছোটোঘর থেকে এসে সাহিত্যে নতুন হাঙ্গামা বাধিয়েছে, রাতরাত-ভর আলোচনা, তর্কাতর্কি, মদ খেয়ে বাড়ি ফেরা, এসব দেখে-টেখে পড়শিরা বুঝত-টুঝত না কিছুই, কিন্তু একটা চাপা আক্রোশ জমাট বেধেছিল। পুলিশের টিকটিকি নজর রেখেছিল এদের ওপর। বিশেষত, 'তিন বিধবা' লিখে শৈলেশ্বরের বেশ হ্যাপা হয়েছিল। তাকে তলব জানিয়েছিল লালবাজারের গোয়েন্দা বিভাগ।... শৈল হাজিরা না দিলে, গোয়েন্দা অফিসার কে.কে. সেনগুপ্ত খোদ কফিহাউসে গিয়ে শৈলশ্বরকে জানান যে তার বিরুদ্ধে গার্লস কলেজের মেয়েদের নালিশ রয়েছে, 'শুধরে যাও বাচ্চা, নাহলে উচিত ব্যবস্থা নেওয়া হবে'। যদি নিরপেক্ষভাবে স্বীকার করি, বলতে বাধা নেই, সেই ছিল হাংরি জেনারেশন নিয়ে পুলিশের প্রথম সক্রিয় পদক্ষেপ।' (অজিত রায়, হাংরি জেনারেশন: গেরো ফাঁসগেরো, বিনির্মাণ দ্বিতীয় সংখ্যা, অগাস্ট ২০০৪)। এরা বলতে এখানে শৈলেশ্বর, সুভাষ, প্রদীপ সুবো, বাসুদেবকেই বুঝিয়েছেন প্রাবন্ধিক অজিত রায়।
(৪) বাসুদেব দাশগুপ্তও বলেছেন- “১৯৬৩-৬৪ সালেই বিভিন্ন জায়গা থেকে শৈলেশ্বর, সুভাষ, প্রদীপ, সুবো, বাসুদেব, সুবিমল, মলয় কলকাতায় এসে মিলিত হয়। একজনের সঙ্গে আরেকজনের যোগাযোগ হতে থাকে। শৈলেশ্বর সুভাষ
তখন টালার এক পচা নর্দমার পাশে অন্ধকার ঘরে থাকতেন এবং চটি পত্রিকা এষণা প্রকাশ করেন। বাসুদেব পাইকপাড়ার এক গলিতে একা, প্রদীপ তখন শান্তিনিকেতন থেকে বিতাড়িত হয়ে কলকাতায় ঘুরে বেড়াচ্ছে, পরে যাদবপুরে সে সুবোর সঙ্গে মিলিত হয়। মলয় এবং সুবিমল তখনও পাটনায়। মলয় সেখান থেকেই তার ম্যানিফেষ্টোগুলি বের করে যাচ্ছিল। এই সময়েরই মধ্যে শৈলেশ্বরের 'ঘোড়ার সঙ্গে ভৌতিক কথাবার্তা' বাসুদেবের 'রন্ধনশালা' প্রদীপের 'সমসাময়িকতা' ও মলয়ের কবিতা ছোটোগল্পের ম্যানিফেষ্টো বেরিয়ে গেছে। উৎপল তখনও সক্রিয় ছিল। ১৯৬৩ জুলাই H.G.15 এ বেরোয় শৈলেশ্বরের 'তিন বিধবা' শীর্ষক বহু বিতর্কিত কবিতা এবং মলয়ের রাজনৈতিক ম্যানিফেষ্টো। তুমুল হৈ চৈ শুরু হয়ে যায়- এমনকি সেসময়ের প্রতিষ্ঠিত তরুণ কবিরা অনেকে সেই কবিতাকে অশ্লীল আখ্যা দেয়। পুলিশ ও মেয়েরা একযোগে আক্রমণ চালাতে শুরু করে। শক্তি চট্টোপাধ্যায় একেবারে সম্পর্ক ছেড়ে কমার্শিয়াল হয়ে যান।” (ক্ষুধার্ত কিংবদন্তী- বাসুদেব দাশগুপ্ত; ক্ষুধার্ত প্রতিরোধ- সম্পাদক: শৈলেশ্বর ঘোষ, ১৯৬৭)
১৬ পাতার যে হাংরি জেনারেশন পত্রিকাটিকে নিয়ে গোলমাল অর্থাৎ থানা-পুলিশ, জেলহাজত সেটি বাসুদেব দাশগুপ্ত, সুভাষ ঘোষ, প্রদীপ চৌধুরী, শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুবো আচার্য পরিকল্পনা করেছিলেন। আর এটিতেও কোনো স্রষ্টা বলে কোনো শব্দের উল্লেখ নেই। এটি (যেই হাংরি জেনারেশন পত্রিকাটির জন্য ১৯৬৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর শৈলেশ্বর ঘোষ ও সুভাষ ঘোষ প্রথম গ্রেপ্তার হয়েছিলেন) ও 'হাংরি জেনারেশন-১৫' ছাড়া অন্য লিফলেটগুলিতে কোনো বিশেষ সাহিত্যকীর্তি চোখে পড়েনি। বলাবাহুল্য যে এইসব ইস্তেহারগুলির কোনো সাহিত্য মূল্য ছিল না। যে কোনো সাহিত্য আন্দোলনকে বিচার করতে হবে তার লেখালিখির নিরিখে, শুধু কয়েকটি কয়েকপাতার রাজনৈতিক ও কবিতা বিষয়ক ম্যানিফেস্টো প্রকাশ ক'রে কোনো সাহিত্য আন্দোলন সৃষ্টি করা সম্ভব ব'লে মনে করি না। মোটামুটিভাবে ধারাবাহিকভাবে দীর্ঘদিন লেখালিখিই একটা সাহিত্য আন্দোলনকে প্রকৃত চেহারা দিতে পারে। ইস্তাহারভিত্তিক যে হাংরি জেনারেশন সেটা শক্তি চট্টোপাধ্যায় শুরু করেছিলেন আর সেটা ছিল এক ধরনের ধর্মীয় মৌলবাদীদের মতো কতগুলি ফতোয়া। পরবর্তীতে যারা প্রকৃত হাংরি জেনারেশন সাহিত্য আন্দোলনকারী তারা নির্দিষ্ট কোনো ধরনের ম্যানিফেস্টোতে বিশ্বাস করতেন না। তারা প্রকৃতপক্ষে সমস্তরকম অবদমন থেকে মুক্তি ও চিন্তার মুক্তপরিসরের কথা বলেন। শক্তির ছিল রূপ আর রসের খিদে। আর শক্তির সাগরেদ মলয়বাবুর ছিল আর্টের বা শিল্পের খিদে। আর প্রকৃত হাংরি সাহিত্য আন্দোলনকারীরা শিল্পটিল্প করতে চাননি। শিল্প ছিল তাদের কাছে ভূসিমাল।