মুলত স্ক্রল এগজিভিশন; এন্ডলেস রিলিসের পাশে একটি লিমিটড থট স্ক্রোলিং,
নিয়মিত পড়ুন, দেখুন, আঁকুন, লিখুন, জ্বালিয়ে দিন...
পুনরায় আলোর বৃশ্চিক
ডিপার্টমেন্টাল স্টোর গৃহবিজ্ঞান: সব্যসাচী রায়
ডিপার্টমেন্টাল স্টোর গৃহবিজ্ঞান
ক্যাশিয়ার স্ক্যান করছে—বাদামের দুধ, অফার-দেওয়া গোল্ড ফ্লেক, একটা থেঁতলানো ডালিম। বিপ। বিপ। ক্ষুদ্র সংগীত। ক্ষুদ্র মহাপ্রলয়। ডিভাইডারের ওপারে এক মহিলা “সেভ দ্য রিভার্স” লেখা ঝোলা ব্যাগ কাঁধে আমার ফ্রোজ়েন পরোটা দেখে এমন তাকাল যেন এগুলোই ভোট দিয়েছিল কোনও স্বৈরশাসককে। তার চুলের কাটিং বলছে—বাড়িতে নিশ্চয়ই তিনটে বই আছে কালেক্টিভ লিবারেশন নিয়ে, আর একটা গোপন প্লেলিস্ট যেখানে এখনও ২০১২-র ব্রেকআপ গান বাজে। ইচ্ছে হচ্ছিল বলে দিই—কালো নেইলপলিশের ওই খসখসে দাগগুলো হেটারোসেক্সুয়াল জীবনের লক্ষণ নয়। কিন্তু সে চলে গেল। অর্গানিক ধনেপাতা তার কবজি থেকে দুলছিল ছোট্ট সবুজ আত্মসমর্পণের পতাকার মতো। কনভেয়র বেল্ট চলতেই থাকে। সভ্যতা সাধারণত তাই করে।
ক্যাশিয়ার স্ক্যান করছে—পেপার টাওয়েল কিনছে মানুষ, যেন সরকারি পরিদর্শনের আগে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার রিহার্সাল দিচ্ছে। মধ্যরাতের বাজার। ফ্লুরোসেন্ট আলো কাঁপছে উদ্বিগ্ন আত্মীয়দের মতো। লোকে অ্যাভোকাডো টিপে দেখছে এমন গুরুত্ব নিয়ে, যেন কোন হৃদপিণ্ডটা বাঁচবে তা ঠিক করছে। আর আমি হাতে ধরে আছি লোকাল টুথপেস্ট। ভাবছি—বাহ। তাহলে এই-ই। এই-ই সেই বিপ্লব, যেটা আর্চিস গ্যালারির কার্ডে কখনও লেখা হয় না। বাইরে শহর তাড়াতাড়ি বন্ধ হয়ে যায়। অন্ধকার ফ্ল্যাটের জানলাগুলো স্তূপ করে রাখা বন্ধ টেলিভিশনের মতো লাগে। তুমি একটা ফলের গন্ধ নাও। চোখ বন্ধ করো। দৃশ্যটা আমাকে একটু নষ্ট করে দেয়। সেক্সি ধরনের নষ্ট না। বরং যেন—ধসে পড়া বাড়ির ভিতরে কেউ একটা বাতি জ্বেলে রেখে গেছে।
আমাকে ইনস্ট্যান্ট নুডলস কিনতে দেখে ভাবে—বাড়িতে তিনটে বারবিকিউ গ্রিল আছে আর ওট মিল্ককে ভয় পায়। ম্যাডাম, আপনি—নৈতিকভাবে সংগ্রহ করা লেবুর ঝুড়ি হাতে, গায়ে হালকা বৃষ্টিজল আর ঋণের গন্ধ। ইচ্ছে হচ্ছিল স্মার্ট কিছু কথা বলি। পিচ ফল নিয়ে। হয়তো ট্রেড ইউনিয়ন নিয়ে। হয়তো দুটো নিয়েই। তার বদলে আপনাকে চলে যেতে দিলাম। আপনার লম্বা স্কার্ফ পিছনে টেনে যাচ্ছিল পৃথিবীর সবচেয়ে দুঃখী মিছিলের ব্যানারের মতো।
স্বয়ংক্রিয় দরজা খুলল।
বন্ধ হল।
আবার খুলল।
:: সব্যসাচী রায়
মৃত জ্যোৎস্নার আয়ু: শুভদীপ সান্যাল
মৃত জ্যোৎস্নার আয়ু
(১০)
বিগত সন্ধ্যায় আমি খুব
ভয় পেয়েছিলাম। বাজপাখিগুলো
ছোঁ-মেরে উড়ে যাচ্ছিল, এভাবে
হাতটাকে ছেড়ে দিলে কেন—
ভরাট জ্যোৎস্নায়
মাংসল হাঁস যেভাবে তাকিয়ে দ্যাখে
মৃদু শিয়ালের চোখ; তোমার মনে হয়?
এ হাওয়ার গন্ধ ওই বাগানের মতো?
মাটির গহনায়—তোমার শরীরে
মাটির গন্ধ পাই; বুদবুদ নিশ্বাস ছিল
উজ্জ্বল প্রিয়, যদি আবারও কবিতা—
তোমাকে ছুঁয়ে আদরে হারিয়ে ফেলি...
পুনরায় ছিঁড়ে নিয়ে যাও ঠোঁটের টিউলিপ।
(১১)
এখন বসন্ত শেষ হতে চলেছে;
কয়েকটা পাখির উৎপাত
বুকের গভীর থেকে
বার করে আনছে অসুস্থতা,
রাতগুলোর একান্ত চিৎকার আছে
এইভেবে চুপ করে থাকি।
ওই পায়রাটা খুব শব্দ করে
আমার ঘরে উঁকি দেয়,
এতো নিয়মানুবর্তিতা খাদক-অধিকার
আমার মাংস
বেছে বেছে খাচ্ছে। আর সেভাবেই
তোমার ফুলের সবুজ বৃত্তের ওপর
একটা কঠিন পোকা ঘোরাফেরা করছে,
সে চিৎকারে অন্ধ করে দিতে পারে
নিজেরই চোখ।
বৃষ্টি এলেই ঘরের দরজাটা খুলে দেবো,
তোমাকে আরও কিছুটা রঙিন দেখাক।
(১২)
তোমাকে উপহারে দিই লাল দস্তানা
কয়েকটা চকমকে শামুকের স্খলন;
নীল তন্দ্রায় চুলের যে বিস্তীর্ণ আকাশ
দেখেছিলে—পানকৌড়ির গতি ততোধিক নরম,
তুমি শুধু ঘুরে যাও,
তোলপাড় ধূলোর অস্থির আদর—
ডুবে মাথা তুলে যে ছায়াটাকে দেখেছি
চেষ্টা করছি বোঝবার হিংসার সমস্ত ইতিহাস;
তোমার ঘুমের কাছে জুঁইফুল ফুটে আছে,
তবু শুনতে পাচ্ছি ময়ূরাক্ষীর ধমনীর ধ্বনি,
এই শঙ্কায় দৃষ্টি আকীর্ণ শান্তি দেবে।
:: শুভদীপ সান্যাল
সোমরাত্রির সূর্যগুহা: সব্যসাচী রায়
সোমরাত্রির সূর্যগুহা
বৃষ্টির পরে শহরের গায়ে যে গন্ধ লেগে থাকে, সেইরকম এক গন্ধ ভেসে ছিল সরাইখানার ভিতর। পুরোনো কাঠের টেবিল, দেওয়ালে মোমের আলো, কোথাও সস্তা তামাক ধোঁয়া, সাম্রাজ্যের ক্লান্তি, পুরোনো। বাইরে নদী আছে কি না বোঝা যায় না, কিন্তু জানালার কাচে মাঝেমধ্যে নীল আলোর মতো কিছু এসে পড়ে। যেন দূরে বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে, অথবা কারও স্মৃতি। সরাইখানার নাম— “মৃত নক্ষত্রের সুরামণ্ডপ।”প্লেটো এক কোণে বসে আছেন। তাঁর সামনে গাঢ় লাল মদ। চোখে এমন এক ধরনের স্থিরতা, যেন এ মানুষ এখনও গুহার দেওয়ালে ছায়া দেখছেন। সামনে শঙ্করাচার্য। আচার্যের সামনে সোমরস। তাঁর মুখে সেই গভীর শান্তি, যা মাঝেমধ্যে নদীর উপর দেখা যায়, যখন স্রোত হঠাৎ নিজের শব্দ ভুলে যায়। কিছুক্ষণ তারা নীরবে বসেছিলেন। তারপর প্লেটো বললেন—
প্লেটো: সত্যে পৌঁছতে হলে মানুষকে উঠতে হয়। ধাপে ধাপে। যুক্তি ছাড়া সত্য মানে তো কুয়াশার ভিতর হাঁটা। দর্শন মই। মানুষ তার সাহায্যে সূর্যের দিকে ওঠে, অন্ধকার থেকে।
শঙ্কর: মই? কিন্তু যে উঠছে, সে-ই তো মায়া। যে সূর্য খুঁজছে, সে-ও মায়া। মই-সহ সবকিছু ভেঙে পড়ে ব্রহ্মের ভিতরে শেষ পর্যন্ত। যুক্তি দরকার, কিন্তু কেবল নদীর ধারে পৌঁছনোর জন্য। জল স্পর্শ করার পরে আর নৌকার প্রয়োজন থাকে না।
প্লেটো মদের পেয়ালায় আঙুল ঘোরালেন। মোমের আলো কেঁপে উঠল।
প্লেটো: যদি সব মায়া হয়, তবে তোমার উপলব্ধিও কি মায়া নয়?
শঙ্কর: স্বপ্নের ভিতরে কেউ যদি বলে— “আমি জেগে উঠেছি”— সেই বাক্যটাও স্বপ্নের অংশ। কিন্তু জেগে ওঠা সত্যি।
অন্যপ্রান্তে বসে থাকা একজন লোক হালকা হেসে উঠলেন। তিনি এতক্ষণ চুপচাপ স্কচের গ্লাসে বরফ ঘুরিয়ে যাচ্ছিলেন। ইতিহাসের ধুলো যেন এখনও তাঁর কোটে লেগে আছে। ইউভাল নোয়াহ হারারি এগিয়ে এলেন।
হারারি: আমি মানুষকে গল্প বলতে দেখেছি অনেকদিন ধরে। জাতি, ধর্ম, অর্থনীতি— সবই কল্পিত ব্যবস্থা। কিন্তু সমস্যা, মানুষ গল্প ছাড়া বাঁচতে পারে না। তাহলে— সত্য কি এমন কিছু, যা মানুষ বহন করতে পারে? নাকি সবসময়ই কিছু ভ্রম দরকার?
শঙ্করাচার্য সোমরসে চুমুক দিলেন।
শঙ্কর: ভ্রম দরকার হয় সেই পর্যন্ত, যতক্ষণ মানুষ নিজেকে শরীর ভাবে। শিশুকে প্রথমে খেলনা দেওয়া হয়। পরে সে আকাশ চিনতে শেখে।
প্লেটো: খেলনাও সত্যের প্রতিরূপ হতে পারে। মানুষ আদর্শের দিকে তাকিয়েই উন্নত হয়।
তখন সরাইখানার মালিক এসে দাঁড়ালেন। মাঝবয়সি মানুষ। চোখে সেই চিরকালীন ক্লান্তি, যা ভোরের বাজারে মাছওয়ালাদের চোখে দেখা যায়। কাচ মুছতে মুছতে বললেন—
সরাইওয়ালা: বাবুরা, একটা কথা জিজ্ঞেস করি? আমার ছেলে গত মাসে মারা গেছে জ্বরে। ডাক্তার বলেছিল ও বাঁচবে। পুরোহিত বলেছিল প্রার্থনা করো। আমি দুটোই করেছিলাম। সত্যি কোনটা? ডাক্তারের যুক্তি, না উপলব্ধি পুরোহিতের?
বাইরে তখন হাওয়া উঠেছে। জানালার ফাঁক দিয়ে কোথা থেকে বালি এসে জমছে মেঝেতে। মোমের শিখা লম্বা হয়ে উঠল।
প্লেটো: সত্য সবসময় হাতে আসে না আমাদের। কিন্তু যুক্তি ভুল কমায় অন্তত।
শঙ্কর: দুঃখ হচ্ছে সেই শিক্ষক, যে অহংকার ভাঙে। ছেলের শরীর চলে গেছে আপনার। কিন্তু যে চেতনা তাকে দেখছিল, তা কোথাও যায়নি।
সরাইওয়ালা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ধীরে বললেন—
সরাইওয়ালা: চেতনা যদি থেকে যায়, তবে রাতে ঘুমোতে গেলে আমার এত শূন্য লাগে কেন?
কেউ উত্তর দিল না। ঠিক তখন দরজা খুলে এক লম্বা মানুষ ভিতরে এলেন। সামরিক কোটে বৃষ্টির জল। মুখে এমন এক ধরনের দৃঢ়তা, যেন দেশ বলতে তিনি এখনও মানুষের চেয়ে বড় কিছু বোঝেন।
তিনি দ্য গল। তিনি কনিয়াক অর্ডার করলেন, তারপর ধীরে বললেন—
দ্য গল: সভ্যতা শুধু ধ্যান দিয়ে চলে না। রাষ্ট্র গড়তে হয় যুক্তি দিয়ে। যুদ্ধক্ষেত্রে উপলব্ধি মানুষকে বাঁচায় না; মানচিত্র বাঁচায়।
শঙ্কর: মানচিত্র নদী নয়।
দ্য গল: কিন্তু নদী পার হতে মানচিত্র দরকার।
প্লেটো হাসলেন। যেন তাঁর পক্ষেই কথা বলা হচ্ছে।
প্লেটো: দেখলে? মানুষকে পথ দেখাতে কাঠামো দরকার। যুক্তি ছাড়া সভ্যতা অন্ধ।
শঙ্কর: আর উপলব্ধি ছাড়া সভ্যতা মৃত।
এইবার এক কোণ থেকে খিকখিক হাসি শোনা গেল। একজন শুকনো মুখের মানুষ এতক্ষণ বিয়ারের গ্লাসে আঙুল ডুবিয়ে রেখেছিলেন। চোখে অস্বস্তিকর এক শূন্যতা। পল পট। তিনি সামনে এসে দাঁড়ালেন।
পল পট: আমি একবার ঠিক করেছিলাম— যুক্তি দিয়ে নতুন সমাজ গড়ব। বই পুড়িয়েছিলাম। শিক্ষকদের মেরেছিলাম। মনে হয়েছিল পুরোনো জ্ঞান মানুষকে দূষিত করে।
সরাইখানার ভিতরে হঠাৎ খুব ঠান্ডা লাগতে শুরু করল।
প্লেটো: তুমি যুক্তিকে নয়, উন্মাদনাকে অনুসরণ করেছিলে।
পল পট: সব উন্মাদনাই নিজেকে যুক্তি বলে পরিচয় দেয়।
হারারি নিচু গলায় বললেন—
হারারি: মানুষ যখন গল্পকে চূড়ান্ত সত্য ভাবে, তখন গণহত্যা শুরু হয়।
শঙ্করাচার্য এবার প্রথমবারের মতো একটু তীব্র হলেন।
শঙ্কর: যে উপলব্ধি মানুষকে হত্যা শেখায়, তা উপলব্ধি নয়। সত্যের প্রথম লক্ষণ করুণা।
প্লেটো ধীরে মাথা নেড়ে বললেন—
প্লেটো: এখানে আমরা একমত।
বাইরে বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে। মনে হচ্ছে শহরের উপর কেউ ধীরে ধীরে কালো জল ঢালছে। ঠিক তখন আরেকজন উঠে দাঁড়ালেন। মোটা চশমা, ক্লান্ত কপাল। এতক্ষণ তিনি নোটবুকে কিছু লিখছিলেন। উইল ডুরান্ট। ওয়াইনের গ্লাস নামিয়ে বললেন—
উইল ডুরান্ট: ইতিহাস লিখতে গিয়ে দেখেছি, মানুষ দুলতে থাকে দুই সত্যবোধের মধ্যে—বুদ্ধির অহংকার আর রহস্যের ক্ষুধা। যে সভ্যতা শুধু যুক্তিকে পূজা করে, শেষ পর্যন্ত যন্ত্রে পরিণত। যে সভ্যতা শুধু রহস্যে ডুবেছে, সে কুসংস্কারে।
সরাইওয়ালা এবার হেসে ফেললেন। সেই হাসিতে ভাঙা দাঁতের ফাঁক দিয়ে মোমের আলো ঢুকে গেল।
সরাইওয়ালা: তা হলে, যা বলছেন, তা হল—মানুষকে রুটি বানাতে যুক্তি দরকার, আর রুটি ভাগ করে খেতে উপলব্ধি?
শঙ্করাচার্য চুপচাপ তাঁর দিকে তাকিয়ে রইলেন। প্লেটো ধীরে পেয়ালা তুললেন।
প্লেটো: হয়তো।
শঙ্করাচার্য: হয়তো সত্য নদীর মতো। একজন তার গভীরতা মাপে, আরেকজন তাতে ডুব দেয়।
নীরবতা। কিছুক্ষণ। তারপর সরাইওয়ালা শেষ প্রশ্নটি করলেন। বাইরে তখন ভোরের আগের সেই নীল অন্ধকার।
সরাইওয়ালা: মানুষ কি সত্যি সত্য চায়? না কি শুধু এমন একটা গল্প চায়, যাতে রাতটা কেটে যায়?
কেউ সঙ্গে সঙ্গে উত্তর দিল না।
শুধু দেখা গেল—প্লেটোর মদের পেয়ালায় মোমের আলো কাঁপছে, আর শঙ্করাচার্যের সোমরসের ভিতরে যেন ধীরে ধীরে আকাশের কোনও পুরোনো নক্ষত্র গলে যাচ্ছে।
:: সব্যসাচী রায়
চম্পূ: কুন্তল দাশগুপ্ত
চম্পূ
(১)
বিতত অন্ধকারে যে পার্লামেন্ট নব-চাঁদ-রাত চায় বৎসর ভর তাকে ভয় করে মহা ইঁদুর সমাজ। গর্ত-নিরাপত্তা পোড়ে প্রাকৃতিক। ইঁদুর মানে না আর ইঁদুরা- বারণ। ইঁদুর-ইঁদুরা প্রাণ লেজেতে খেলিয়ে দাঁত ঘষা সাধনার তোরজোর করে। কৃষ্ণ চতুর্দশী রাতে ভূত নামে রোগা পৃথিবীর যত মাঠে ময়দানে বিবিধ নামান্তরে হরি হরি ব'লে। বোল ফাটে, ঢোল ফাটে না, বাজে তা বাজে। তা-তে ডিম ফুটে বাড়ে পার্লামেন্ট। বোধিবৃক্ষের থেকে ইঁদুর কুড়োতে নেমে ইঁদুরার স্তন খোবলায় যাতে বন্দনা সেজেগুজে হাওয়ার হয়।
আলো ফুটলেই গোটা পার্লামেন্টে অন্ধত্ব ভীষণ স্বাভাবিক।
(২)
আলো মরে গেলে বর্ণান্ধ পৃথিবীর অশ্মমণ্ডলে শুরু হয় খাইবার পথের চলাচল চরাচর মগ্ন হয় আমূল শোষণে বাতাস বাড়িতে থাকা জারিত অঙ্গার বিজারিত হয় শৈবাল সাগরের বদান্যতায় নিয়নাভ থেকে অগ্নিভ হয়ে উঠতে উঠতে শৈবাল দল আত্মদানের মাহাত্ম্যে অম্লজানের আলপনা এঁকে বিচিত্র ক'রে চলে বাতাসের বাড়ি রশ্মির মাস্তানি তামাদি হয়ে দেখে টেথিসের বিভঙ্গ মুদ্রা আলো মরে গেলে সিয়াল-সিমা গর্ভিণী মহাকাশ…
(৩)
রোসো ঠোঁট ফাঁক ক'রে দাঁড়াও চুমু নয় চমৎকার চিৎকার ছিটকে পড়ুক বীর্যবান কুহর কুহকে প'ড়ে বিঁধে যাক চিৎ-পাত চোষো মজ্জা লোহিত উৎস পরিপাকে মুহ্যমান ধর্ষক দর্শক হতে হতে জানুহীন মাংস খসে উঠে আসছে বুক পাঁজরার হাড়… দধীচি
(৪)
কালচার ভালচারে ঠুকরে দেবার আগে ব্রণ বয়সের হিসেব নেবার জন্যে রেডিও ছিল আকাশ বাণীর। এখন আবহে বাজে শব্দ ঘানির সঙ্গে নিজের গলা সুরে বসা নয় তবুও গাইছি আমরা করব ভয়… মদের গেলাসে নীল বুকের মুক্তো রেখে ফ্রেমে ধরা দিতে যারা নিযুক্ত ছিল তারা জানতো না প্রেম কোনো গেম নয় বরং স্বদেশ নিকষিত হেম— শ্যামার প্রসাদে কাটা ছাঁটা হয়ে প'ড়ে ছ্যাঁচড়াতে থাকে ট্রাম লাইনটি ধ'রে। পশ্চিম বাঙালীরা সেই থেকে ঘেমে রোমান্টিকতা গুলে আজিও প্রথমে পান করে তার পরে মানুষ ওড়ায় নকশাল বাড়িটাড়ি ভেঙে পড়ে যায়। শতক্রোশ ছুটে ফেরা আক্রোশ মিলে স্যাক্সোফোনের ঘাত নীরেট পাঁচিলে ফাটল ধরিয়ে দিয়ে সুশীলের কান ছিঁড়ে নিয়ে গেয়ে ওঠে রাসভের গান অনাহারী কবিতার এই দস্তুর আহারী বাহারী যত ন্যাকা বস্তুর লালা-ভিজে মালিকার কুসুমিত ফাঁস থামাতে পারে না রূঢ় কবিতার চাষ।
(৫)
আমি তোমার প্রেমিক ছিলাম না যে তবুও ছুঁই তোমার অথৈ একা নখর ভেজাই নয়ন অন্ধ ক'রে শির ঝুঁকে যায় অক্ষরে অক্ষরে শিহরটুকু বর্ষাবনের কেকা আছড়ে পড়ে লোকান্তরের কানে তোমার যত প্রেমিক পুরাতন শুনতে পেয়ে তোমার ছলাৎ-ছল অরব ভাষে গাঁথবে ধ্বনির মালা খোঁপায় নাহয় জড়িয়ে রেখে দেখো পেনসিলটা টানছে হরফ ফিকে আয়ত চোখ গভীর দৃষ্টিপাতে রং ফেরাবে সে সব লিপিকাদের প্ল্যানচেটে ডাক শুনতে চেয়ে চেয়ে আমার ভীষণ মরতে ইচ্ছে করে
(৬)
ফড়িং-এর মস্তকে ঘাসের মাতব্বরি দেখে তৃণভোজী ভেবে নিয়ে ওমনিভোরাস চাখবার মতলবে ঘাস চাষে মন দিয়ে নোলার তৃপ্তি নিশ্চিত করা থেকে বহুদূর দূরে কেউ থাকতে চায়নি পৃথিবীর যত শত অবিশ্বাস্য ঘাস-জমি সেইদিন ভারি হেসেছিল ফুলকে তো হাসি বলে গাছেদের।
ঘাসেদের?
ঘাস-জমি বেড় দিয়ে হৈচৈ ক'রে চলা নদী বেনো জল বয়ে এনে প্রফুল্ল ঘাস-জমি ডুবিয়ে দিয়েছে ফলে হাঁটু জলে গরুগুলো দাঁড়িয়ে রয়েছে সলিল সমাধি হবে জেনে।
:: কুন্তল দাশগুপ্ত
আশীষ সাহার কবিতা
১।
হে মুগ্ধ প্লাস্টিকের সিঁড়ি
অনেক গামছা জড়ো করে তোমাদের
বিবাহ হয়েছে আমিও বৃষ্টি নামাতে পারি
হাতগুলো গোলাকার পৃথিবীর মতো
বিল কেটে চলে যায়
তারারা
কালিতে লেখা ফুরিয়ে গেলে হয়না হয়না
বিপ বিপ
বই
২।
বই পড়া ভালো অনেক সচল সেতু উড়ে এসে আমাকে খেয়েছে
শুদ্ধ ফলের মতো
অনেক উপমা খেয়েছে উদাহরণে বলা যায় তোমার দুধ ঘষা
নদী
তৎপরতার সাথে জল হয়ে
নদীতে মিউজিক প্লে আমার আঙুলগুলো জ্বলে ওঠে
কত কম বয়সে আমরা শিখে গেছি আগুন নিয়ে খেলা করা চেয়ার ভেঙে ভেঙে চেহারার এই দশা হল
:: আশীষ সাহা
জয়ন্ত দাসের কবিতা
[১]
কিভাবে বিনাশ মূহূর্তগুলি ভুলে যাই
অন্য একটি মন যখন
রিরংসায় খেয়ে নেয় বিহ্বল শীৎকার!
রাত্রি মুগ্ধ হয়! বন্ধ হাওয়া চোখ মেলে,
সৃষ্টির বীজ নেমে আসে ভূমিতে,
মাটি ভেদ করে উৎসারে ঘুমন্ত অঙ্কুর!
এখানে দাঁড়িয়ে আছেন স্বয়ং ঈশ্বর,
এখানে চরে জীবনজুড়ে দুগ্ধবতী গাভী,
যোনিপর্ব যুগে যুগে, রেতঃ উৎসবে!
[২]
তোমাদের হয়েছে কী ! কী নাম অসুখের!
গর্জনমান সমুদ্র স্রোত থেকে
কুড়িয়ে আনতে পারনা কুঠার?
শুধু মুষড়ে পড়া টেবিলের উপর, স্যাঁতস্যাঁতে ভুঁয়ে,
ভেঙে পড়া মাথা, আর জিরিয়ে নেওয়া বালিয়াড়ি !
একটা কষ্টকল্পিত নারীদেহে বীর্য ঢালা...!
আছে তো জানি তোমাদের সব, আপন হল না কেউ,
যুগান্তের সমুদ্র মর্মযন্ত্রনা, উদ্বাস্তু মন, দিনগুলো
তোমাদের গলে যায়, হৃদয় ভাগাভাগি কাঁটাতার,
প্রত্যক্ষ পচন,
রাত্রিগুলো দৌড়ে আসে সুউচ্চ শ্বাসরোধ! তোমরা
সড়ক বরাবর দৌড়াও, আফিংফূল খুঁজো,
সেই সংগে খোঁজ মাগলা ফসল, আর
মিশ্র শ্রদ্ধা তুলে দাও মার্ক্সের ভুল, মৃত দেহে,
পথের ছালহীন লোমহীন কুকুর বানাও সাথী, স্বজন!
সমুদ্রের কুঠার তোমরা পেতে পারো, যদি হয়ে যাও
প্রখর সূর্য, সততা, আর আর সূর্যের শপথ!
:: জয়ন্ত দাস
অগ্নিভ ভট্টাচার্যের কবিতা
[১]
অন্ধ ভূ-স্তবকের নীচে আগুনের মতো জেগে ওঠা উলঙ্গ বীজ—বিদ্রোহের গর্ভসঙ্গীত,
ত্বক ভাসছে ধূসর জোয়ারে—আলোর লবণ মাখা এক বন্য উন্মোচন,
দ্যাখো, জ্যামিতিক চাঁদের দুধসাদা বিদীর্নিতায় আবির্ভূত অরণ্য—
শিরায় শিরায় বিস্তৃতিতে বিলীন হচ্ছে উচ্ছৃঙ্খল সবুজে,
অস্থি লিখে চলা নিজস্ব লিপি—মাংসের ভেতর গোপন অভ্যুত্থানার মতো।
রক্তে জ্বলে ওঠে জ্যোৎস্নাভাঙ্গা জ্যোতি—দহনশাস্ত্রের গূঢ় মানচিত্রে,
পৃথিবীর নিঃশব্দ গহ্বর থেকে প্রকাশিত দিগন্তচূর্ণ শ্বাস—
শরীর ছিলো তারই বহমান স্ফুলিঙ্গ,
ঘুমন্ত গ্যালাক্সির বদ্ধ কপালে হঠাৎ ফেটে পড়লে উল্টো-প্রজন্মের জল—
নিজেকে অতিক্রম করে অনির্বাণ অগ্নিচিহ্নে।
[২]
কলকাতার প্রাচীন সিঁড়ির নিচে জমে থাকা নিবিড় ছায়া—
ক্ষীণ আলোয় ভেজা পুরোনো প্রেমের চিঠীর মতো,
রাস্তা ভরে উঠলে অদৃশ্য পায়ের শব্দে—
প্রতিটি ধাপে জন্ম ন্যায় ভুলে যাওয়া প্রেমিকের ডাকনাম,
গোপন স্থিরতায় আবৃত নরম আগুনের ছিন্ন গোধূলি—
শিখাহীন প্রতিফলনে জ্বলে ওঠে বারংবার।
কলেজ স্ট্রিটের পড়ন্ত বিকেল—এক বিপরীত স্রোতের বাদামী নদী,
নির্লিপ্ত কবিতা হয়ে ভেসে যায়
ভাঙ্গা আয়নার স্মৃতি প্রবাহে,
অবাধ্য শূন্যতায় দাঁড়ানো কফি হাউসে ক্লান্ত এক কবির শব্দহীন অনুবাদে,
নেমে আসে চুমু শব্দের ভুল বানান।
আর আমরা, এক দূরত্বে দাঁড়িয়ে থাকা কিছু অচেনা মুহূর্ত,
নিঃশ্বাসের ভেতর জমিয়ে রাখছিলাম ভবিষ্যতের নীরবতা।
:: অগ্নিভ ভট্টাচার্য
কুন্তল দাশগুপ্তের কবিতা
রাঙা পথ ভাঙা হলে বাড়াবাড়ি হয়
গাঁদায় গ্যাঁদালে মিশে পরিমল ওড়ে
বাউলের ছেঁড়া দিন থাকে অক্ষয়।
বর্গ খড়গ হয়ে কটাক্ষ ছোঁড়ে
লালমেঘ সাঁতরিয়ে ওঠা মুনিয়ায়
তাক ক'রে বিঁধে যাতে ফাক ক'রে মরে।
হজম হচ্ছে ভালো আজ দুনিয়ায়
মাছের মাংস খেয়ে নাচছে ভেড়ারা
হরিণেরা ঘাস ছেড়ে রাজভোগ খায়।
হরিতলা যেতে চেয়ে নেক্কু ন্যাড়ারা
বেলতলা গিয়ে পড়ে স্ক্রিপ্টের ঝোঁকে
উঁচু ডালে বাঁধা মই বাইছে গ্যাঁড়ারা।
বস্তা বস্তা নুন খেতে দেখে জোঁকে
পাখি হতে আরশোলা বোরোলিন শোঁকে।
:: কুন্তল দাশগুপ্ত
সৌমাল্য চ্যাটার্জির কবিতা
যে মাঠে আগে গরু চরে বেড়াত
সেখানে একটা খাঁচাবন্দী সিংহ রাখা,
খাঁচার চারপাশে ঘুরে বেড়াচ্ছে হায়না
ধ্বংসের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আমরা প্রত্যেকে
অথচ আগুনে পুড়ছি আমি একা
এত ঘন ঘন নির্বাচন আমার ভালো লাগে না
শহর ছেড়ে পালিয়ে যাই শহরতলিতে,
সেখানেও দেখি: তাপ্পি মারা পোস্টার, ছেঁড়া ব্যানার, প্ল্যাকার্ড...
অন্ধকে কেউ বিক্রি করছে চশমা
মূর্খকে ইশতেহার
:: সৌমাল্য চ্যাটার্জি
দৃশ্যের দুটি দীর্ঘ-দাঁত: অগ্নিভ ভট্টাচার্য
ইন্টেরিয়র না এক্সটেরিয়র—ভাবতে পারছিনা,
ফেড-ইন: এক মৃত ধূসরতা—
য্যানো গলিত সীসার ওপর শুয়ে আছে সন্ধ্যার ক্ষয়িষ্ণু ত্বক,
সময় অবরুদ্ধ, অনির্দিষ্ট, অবৈধ।
লং শট—
ফ্রেমের মধ্যে শূন্যতা এক বিকৃত চরিত্র হয়ে দাঁড়ায়ে,
নিজস্ব কঙ্কাল চিবোতে থাকা কোনো প্রাচীন জন্তুর মতো,
অস্তিত্ব তার দাঁতের ফাঁকে ধীরে ধীরে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে।
ক্যামেরা রোলিং—
অস্বস্তিকর ধীরতায়,
য্যানো মৃত নদীর বুকে উল্টো স্রোতে ভেসে ওঠা নৌকা,
দূরত্ব স্তর স্তর চামড়ার মতো খসে পড়ছে,
ফোকাস ভেঙে যায় ভাঙা আয়নার মতো,
আবার জোড়া লাগে বিকৃত প্রতিফলনে—
বাস্তব ও স্মৃতি
দুইটি বিষাক্ত লতার মতো জড়িয়ে ধরেছে একে অপরকে।
অফ-স্ক্রিনে শব্দ—
গলায় আটকে থাকা ছাই,
উষ্ণ নিঃশ্বাসে পরিণত হয়,
অর্থ পচে গিয়ে জন্ম দ্যায় এক অদ্ভুত দুর্গন্ধময় ভাষা।
মিড শট—
স্থিরতা জ্বরাক্রান্ত শরীরের মতো কাঁপে,
তার ভেতর কিলবিল করছে অদৃশ্য পোকামাকড়ের গতি,
সময়কে টেনে নিয়ে যায়
কাদায় ডুবে থাকা কোনো পশুর মৃতদেহের মতো,
ছায়া পৌঁছানোর আগেই শুকিয়ে গ্যাছে।
কাট টু:
একই ফ্রেম—
পুরোনো ক্ষতের ওপর নতুন চামড়া,
আলো উঠে আসে হাড়ের গুঁড়োর মতো শুষ্ক,
স্থান নিজের অতীতকে ছিঁড়ে ফ্যালে—
যেভাবে জন্মের আগেই লেখা ইতিহাস পুড়িয়ে দেওয়া হয়।
ক্লোজ শট—
একটি নগ্ন নারী—
তার শরীর এক খোলা পৃথিবী,
যেখানে নদীর বদলে বয়ে যায় জমাট অন্ধকার,
ত্বক পুড়ে যাওয়া পার্চমেন্ট,
প্রতিটি রেখা একেকটি বিস্মৃত ভাষার দাগ,
শূন্যতা তাকে ঘিরে রাখে
কোনো প্রাচীন আচারবিধির কেন্দ্রবিন্দুর মতো।
দীর্ঘ নীরবতা—
ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়া শব্দের স্তূপ,
ধীরে ধীরে শ্বাস থ্যালা,
মৃত্তিকাকাতোর আকাশ।
ক্যামেরা স্থির—
শল্যচিকিৎসকের ঠান্ডা হাত,
দৃষ্টি কেটে খুলে ফ্যালা স্তরাইতো বাস্তবের মাংস।
সাউন্ড ড্রপ—
সমস্ত ধ্বনি একসাথে অন্ধ খাদে নিক্ষিপ্ত হোচ্ছে,
আলো নিভে যাওয়ার আগের সেই ক্ষুদ্র, বিকৃত, অনিবার্য মুহূর্ত—
কাট
:: অগ্নিভ ভট্টাচার্য
তুমি, অধরা তুমি: শুভদীপ সান্যাল
তুমি, অধরা তুমি
(১)
তোমাকে প্রতিবার ভুল বুঝি
নদীর পার গুলো শক্ত নেই আর
আগের চেহারায়,
বিছানার মতো একটি তপ্ত হ্রদ
জড়িয়ে রাখে সবুজের নির্লপ্ততা!
শরীরকে দেখি কিভাবে?— যন্ত্রণা ঢেউ ফেলে
এগিয়ে আসে; থ্যাঁতো গোলাপের মতো ক্ষতগুলো
গাঢ়রঙে পাপড়ি ভিজিয়েছে:—
এই, তুমি নখটাকে এইভাবে টানো
যে রেখা সুচারু আমার মুখের তুল্য...
শুধু মা-মা আচরণগুলো ভালো লাগছে না;
আমার মনে আছে, আমার ছায়া
তোমার থেকেও তীব্র অন্ধকার।
(২)
চোখ ঘষলেই আলো ফুটে উঠতে দেখি,
তীব্র মুখ—গলগলে রক্তের প্রশ্বাস,
আমাকে ভুলরকম চেনো তুমি;
প্রতিটি ধাক্কায় হাড়গুলো আমার
উত্থিত করাত: আদতে আমাকে বোঝো না,
আমাকে জানো না,
চেনো না আমার জিভের রঙ
আমার থুতুতে গলে যাবে এইসব কবিতার ধার,
মাড়ি দাঁত, সবুজ তালু ভারশূন্য খুলে আছে
এখন বারো গ্যালন মদ ঢালি বিছানায়
দীর্ঘ ঘুমের নেশার মতো গন্ধ তোমার শরীরে
এই ঘুম সরু হতে-হতে
ইঁদুরের দাঁতের শব্দেও চোখ খুলে যায় আমার।
:: শুভদীপ সান্যাল
কবিতা: প্রগত
সাঁকো
এই সাঁকোর বুকে একদিন কবিতা আর মাংসের ব্যাগ নিয়ে
দাঁড়িয়ে থাকতো অন্তর্লীনা— নীচ দিয়ে ঝর্ণার জল
একদিন বয়ে যেত নিঃশব্দে
পাথরের ফাঁক দিয়ে একটা ছোটো মাছ
লেজ নাড়িয়ে চলে গেল স্রোতে
বড়ো মাছ একদিন আসবে
এই আশায় আমি বসেছিলাম সাঁকোর কাছে
তারপর রাত হলো— নক্ষত্রেরা জ্বলে উঠলো ধীরে ধীরে
মাংসের গন্ধে বুনো আত্মারা জাগে—
স্রিয়মান জোৎস্নায়
কেউ যেন হেঁটে যায়
পাহাড়ের গা বেয়ে
একদিকে অন্তর্লীনা
আরেকদিকে আমি
মাঝখানে পোড়া বাঁশের নিস্তব্ধ সাঁকো
ঘাসফড়িং
অদ্ভুত কম্পোজিশনে ঘাসের মাঝ বরাবর দিয়ে
ঢেউ উঠেছে— ক্রমশই বদলে যাচ্ছে
মাঠের অর্কেস্ট্রা
ঘাসফড়িংয়ের ডানায় আজ উত্তেজনা—
অনেকদিন পর যেন এরকম
উত্তেজিত হয়েছে সে
যেরকমটা একদিন হয়েছিল—
যখন এইরকমই
স্যাটেলাইট নক্ষত্রভরা রাতে
মাঠের ভেতর
স্বপ্নের মতো ঘাসে
এসে বসেছিল— আরেকটি ঘাসফড়িং
এই ঘাসফড়িংটির পাশে
:: প্রগত
কবরপ্রণালী: নীল চক্রবর্তী
কবরপ্রণালী
ফুলেদের দীর্ঘশ্বাসেই কি গজিয়েছে কবর!
কোথায় ঝরে গেছো পুষ্পরাজি-হে
কোন অকূল পাথারে
ছাই মেখে ফিরে এসে সে শ্মশান বালক
কোথায় ঘুমাবে তবে নিশ্ছিদ্র অন্ধকারে
বুলেটের গর্জন পাগল করেছে তাকে
দেখেছে সে মানুষ দল বাঁধে, দেখেছে মানুষ একা মরে
সে একা কেন একা এই সমুদ্রের ধারে
নীল পাখিদের গান শুনে মুখটুকু বিকেলের আভায়
পুড়ে যায় বারবার
খই ফুটে ওঠে পৃথিবীর আদিম জঠরে
শেষ যুদ্ধের খোঁজে রক্তনালীগুলি কুড়িয়ে আনে নারী
পুরুষ ক্ষিপ্র হাতে ধ'রে তরবারি ছুটে যায় ঘোড়া নিয়ে
চিঠি পড়ে থাকে শুধু প্রতীক্ষমান অভিজ্ঞতায়
দূর থেকে শব্দ ওঠে স্মৃতির, হা রে রে রে রে রে
ফুল কেন ঝরে যায়, ফুল! তুমি কোথায় ঝড়ে যাবে!
কবিতার বই থেকে, বায়সীর ঠোঁট থেকে
কবর গজায় পৃথিবীতে, অন্তিম চুম্বনে মৃত্যু ঝরে পড়ে...
:: নীল চক্রবর্তী
ডিস্কোর্স ডাইরি: শুভদীপ সান্যাল
ডিস্কোর্স ডাইরি
স্বপ্নগুলো নিয়মিত আহত করে—বিছানার ভেজা চাদরটা স্বপ্নের ভেতরে যেন আমারই সাথে ডুবে ছিল; ঘুম ভেঙে ঘামের গন্ধেই নিজেকে খুঁজে পাই, লাইটারটা সারারাত পিঠের নীচে ছিল হয়তো তাই জ্বলছে, কিছুটা রক্ত হয়তো বেরিয়েছে! আমার চোখের পেছনে যা কিছু রক্ত-মেদ-মাংস, তা অনুভব করার ক্ষমতা আমার নেই, আমি নিজের শরীরটাকেই দেখতে পাচ্ছি না আর—থুঃ থু, আয়নায় শুধু অশ্লীল দৃশ্য, তাই বলে এতোগুলো মানুষ আমাকে একসাথে ঘিরে ধরবে?—আমি তাদেরকে কোনভাবেই বোঝাতে পারছি না আমার মাংসগুলো আমার অপরিচিত, পিঠটা যেখানে চুলকোচ্ছে চিরুনি খুঁজে না পেয়ে একবার ভাবলাম পেপার-কাটারটা দিয়ে একবার চুলকে নিলে কেমন হয়! আমি নিজের রক্তের দিকে একভাবে তাকিয়ে থাকি, কতো উজ্জ্বলতা আমার, কতোরূপ সুন্দর আমি, একটা তীব্র রঙ বেরিয়ে আসে আমার শরীর থেকে, সেল্ফ হার্মের মজাটা ওই কাঁচা মাংসেই পাওয়া যায়, ক্লাস এইটেই পড়তাম মনে হয়, ঘুষিটা আমার দাঁতে লেগেছিল আর আমি ওর মাথাটা ফাটিয়ে দিয়েছিলাম, গার্জেন কল হয়েছিল, কথা সেটা না— কিন্তু ওই, মুখ ফুটে রক্ত বেরোচ্ছে, মেঝের ওপরে চকচকে রক্তের ওপর নিজের মুখটাকে দেখেছিলাম, কতো আর আত্মতদন্ত, হাতটাকে কতোটা খুঁড়লে আমি দৃশ্য দেখতে পাবো?—এইটাই ফার্স্টটাইম আমি খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হাঁটছি, বীভৎস মোচড় খেয়েছি পায়ে, হাঁটুর ভেতর যেন গোড়ালি ঢুকে গ্যাছে, এক-কদম সিঁড়িটাকে পাহাড় মনে হচ্ছে আর দেহটাকে বিরাটাকার পাথর, গড়িয়ে ওঠার সিঁড়ি অনন্তকাল, সারফেস পাবো তাই ডুবন্ত হাতড়েছি জল, দেওয়ালে যে ছায়াটা পড়েছে এলোমেলো খাঁড়া চুলগুলোই একটা স্কাল্পচার, ছায়ার রক্ত নেই, তাই কোনো ছায়াই আমার নয়, ব্যথাগুলোকে চূড়ান্ত নেশার মতো ফিল করছি আজকাল।
:: শুভদীপ সান্যাল