ঘোড়ার পেটে চাঁদের মাংস
সূর্যাভ বিশ্বাস
[অধ্যায়: প্রবেশক]
এখানেই গল্পটা ফুরিয়ে গেলো।
অতএব আমার কথাটি ফুরালো
নটে গাছটি মুড়ালো।
তবু নটে গাছ মুড়ালেই কি আর গল্প ফুরিয়ে যায়?
আমি বললাম শেষ থেকেই তো সব কিছুর শুরু
ধ্বংসের পর সৃষ্টি, মৃত্যুর পর জন্ম,রাতের পর দিন
তবে নটে গাছ মুড়োলেই গল্প ফুরিয়ে যাবে কেন?
এ কথার কেউ তেমন জুতসই জবাব দিলো না।
মুখ দেখে মনে হলো কেউ কেউ আগ বাড়িয়ে তর্ক করতে চাইছে কিন্তু উপযুক্ত যুক্তির অভাবে
করে উঠতে পারছে না। অবিনাশ বাবু যেখানে এসে থামলেন আর ঘোষণা করলেন যে গল্পটি শেষ হয়ে গেছে, কেন জানিনা আমার মনে হলো যে আসল গল্পটা ঠিক ওইখান থেকেই গড়াতে শুরু করবে।
গড়াতে গড়াতে গড়াতে গড়াতে
গড়াতে গড়াতে গড়াতে গড়াতে অনেকেই টের পাবে
আসলে এভাবে পৃথিবীর কোনো গল্পই কোনোদিন ফুরিয়ে যায় না। ফুরিয়ে যায় গল্প কথকের গল্প বলার তাগিদ। চরিত্রগুলোর ভেতর অদৃশ্য কথোপকথন চলতে থাকে।যেমন রাতের জঙ্গল। ঝরনার শব্দ। পশুর চিৎকার। শিকারীর টোপ। শিকারের সতর্ক চলাচল।
[অধ্যায়: মৃত শহরের অবিচুয়ারি]
আমি বুঝতে পারি অনেকেই এটা আশা করেন-নি।
অনেক পাঠকই ভীষণ বিভ্রান্ত বোধ করছেন এখন।
তবু জানবেন গল্পটা কিন্তু এখনও শেষ হয়নি কারণ পৃথিবীর কোনো গল্পই কোনোদিন ফুরিয়ে যায় না।
এই যে কল্পনার ভেতর দিয়ে চলে যাচ্ছে যে বিকেলের ট্রাম কিংবা রেল কলোনীর অন্ধকারে যে মেয়েটা তার শরীর বিক্রি করছে তার গল্প কোথায় গিয়ে থামে কে জানে! একটা ট্রামের গল্প যেভাবে তার রাস্তা খুঁজে ন্যায় ঠিক সেভাবেই একটা বেশ্যার গল্প শরীর পেরিয়ে, ধানক্ষেত পেরিয়ে, জোনাকির গন্ধ পেরিয়ে
শীতের কুয়াশা পেরিয়ে, হিমজল পেরিয়ে এগিয়ে যেতে থাকে।
আমরা মার্জিনের ভেতরের গল্পটুকু
মনে রাখতে রাখতে
মনে রাখতে রাখতে
মনে রাখতে রাখতে
অরূপ ঘরে ফিরে আসে। ঘরের ভেতর একটাই জানলা। গলির দিকের জানলা খুলে দ্যায়। চাঁদ ফুটে ওঠে। যেন গল্পের খাতিরে তাকে ফুটে উঠতেই হতো। এইসব পূর্বনির্ধারিত চর্বিতচর্ব্যণ যেকোনো আখ্যানকে আরেকটু ফাঁপা করে দ্যায়। তবু অরূপ সেই খোলা জানলায় কান পাতে।
গানের শব্দ ভেসে আসে।
হাসির শব্দ ভেসে আসে।
চুড়ির শব্দ ভেসে আসে।
ট্রামের শব্দ ভেসে আসে।
অবিনাশ বাবুর গল্পটা যেন ঠিক এখান থেকেই শুরু হতে পারে।
অথচ অবিনাশ বাবুর ভেতর গল্পটা থেমে যায়।
পাঠকের ভেতরেও গল্পটা থেমে যায়।
অরূপের ভেতরেও গল্পটা থেমে যায়।
এরপর থেকে আমি লিখতে থাকি।
এরপর আমি অরূপ হয়ে উঠি
অথবা অরূপ আমার মতো।
খোলা জানলা দিয়ে
গানের শব্দ ভেসে আসে।
হাসির শব্দ ভেসে আসে।
চুড়ির শব্দ ভেসে আসে।
ট্রামের শব্দ ভেসে আসে।
সেই ট্রাম যে ট্রামে করে অরূপ কিংবা আমি ধর্মতলা
যেতে থাকি। শীত ফুরিয়ে যেতে থাকে। দিন ফুরিয়ে যেতে থাকে। সময় ফুরিয়ে যেতে থাকে।তবু প্রচুর ঘটনা ঘটতে বাকি থেকে যায় অথবা ঘটতে থাকে অনেক ভেতরে। পাঠক মার্জিনের ভেতরেই ঘুরঘুর করতে থাকে। কারণ পৃথিবীর কোনো গল্পই কোনোদিন ফুরিয়ে যায় না।
[অধ্যায়: কুমারী সন্ধ্যে কিংবা দধীচির হাড়]
গল্পেরা মার্জিন পেরিয়ে গানের শব্দ, পেরিয়ে
হাসির শব্দ, পেরিয়ে চুড়ির শব্দ, পেরিয়ে ট্রামের শব্দ পেরিয়ে, অরূপকে পেরিয়ে, পাঠককে পেরিয়ে গিয়ে দাঁড়ায় অগ্নিভ যেখানে দাঁড়িয়ে সিগারেট খাচ্ছে সেই ভেঙে পড়া আখ্যানের ভেতর।
পাঠক হতাশ হতে গিয়েও যেন ধনুকের ছিলার মতো টানটান করে মেরুদন্ড যেন এবার গল্পের ভেতর নিশ্চিত কিছু একটা হবেই। কারণ নটেগাছ মুড়িয়ে গেলেও পৃথিবীতে ঢের গল্প লিখতে বাকি আছে।
অগ্নিভ লিখতে শুরু করে। যেটা অবিনাশ বাবু লেখেননি। যেটা অরূপ লেখেনি। যেটা আমি লিখিনি যেটা অগ্নিভ নিজেও লেখেনি কখনও সেই লেখাটা লিখতে শুরু করে।
আবার একটা জানলা খুলে যায়। একটা মৃত গলি।
মৃত গলির ওপর শুয়ে থাকে ন্যাংটো চাঁদের আলো।
জানলা দিয়ে মেঘের মতো চিৎকার ভেসে আসে।
জানলা দিয়ে হাওয়ার মতো শীৎকার ভেসে আসে।
সফেদ জ্যোৎস্নায় ডুবে যায় নূপুরের শব্দ কিংবা বিছানা। হাসির শব্দ যেন যৌনকৌতুকের মতো ধাক্কা মারে প্রবল সম্ভাবনাময় এক আনকোরা গল্পের বীজে। অগ্নিভ পেন নামিয়ে রাখে।
বিশ্রামের ভেতর ছড়িয়ে রাখে অযুত সম্মোহন।
তৎক্ষণাৎ—
১) ভার্জিনিটি হারিয়ে ফ্যালে একটা প্রাচীন হারমোনিয়াম। যেন মাছের রক্তের ভেতর চুপ করে বসে থাকে একটা আঁশটে দিন। (পড়ুন আচ্ছে দিন)
২) একটা উপত্যকায় প্রজাপতির ডানা থেকে ক্রমাগত চুঁইয়ে পড়ে বিষণ্ণ বারুদের গন্ধ।
৩) অন্ধ বুলেটের দাগ পিঠে নিয়ে ছুটতে থাকে একটা অল্পবয়েসী ছেলে।
৪) একটা একটা করে মেয়ে সড়কের মাঝখান থেকে উধাও হয়ে যায় প্রতি পূর্ণিমায়।
৫) একটা অবসাদগ্রস্থ নটেগাছ নিজেকেই নিজের আত্মহত্যায় প্ররোচনা দ্যায়। তারপর দীর্ঘ ছায়াপথ পেঁচিয়ে ফেলতে থাকে নিজের পেলব গলায়।
অগ্নিভ ভাবে তবে কি সত্যিই পৃথিবীর থেকে ক্রমশ গল্প ফুরিয়ে যাচ্ছে! তবে কি অবিনাশ বাবুর ঘোষণাটাই ঠিক! চশমার কাঁচ ঘষে পুনরায় লিখতে শুরু করবে ভাবতেই অগ্নিভ টের পায় ওর পেনটা কখন যেন চুরি হয়ে গ্যাছে।
[অধ্যায়: নরম মাংসের পৃথিবীতে]
একটা শাদাটে জ্যোৎস্নার ভেতর, জেগে ওঠা স্তনের মতো নরম ঘাসে মুখ ডুবিয়ে রাখা একটা শান্ত ঘোড়া হঠাৎ ঘাসের সঙ্গেই গিলে ফ্যালে একটা আস্ত পেন।
তারপর থেকেই তার ভেতর বদল আসতে থাকে। প্রথমেই তাকে ঘোড়াসমাজের একদল হর্তাকর্তা ও আস্তাবল অ্যাসোসিয়েশন একঘরে করে দ্যায়। কারণ সে নাকি অন্ধ জ্যোৎস্নার বীজ খুঁটে খেয়ে ফেলছে চাঁদের নরম মাংস। যা ঘোড়াসমাজে প্রবলভাবে নিষিদ্ধ। এবং যা তাকে করে তুলেছে খ্যাপাটে।
তাকে জিন পরিয়ে বশে রাখা যাচ্ছেনা। সে নাকি আস্তাবলের অন্য ঘোড়াদের ফুসলে নিয়ে যাচ্ছে দূরের ঐ চাঁদের পাহাড়ে যেখানে চাঁদের মাংসের অপূর্ব স্বাদ।
অথচ তাহলে তো আস্তাবলের ঘাসজমি শুকিয়ে হলুদ হয়ে যাবে।
বাচ্চারা বিকেলে খেলতে আসবে না মাঠে,
বয়স্করা ভাতা নিয়ে আলোচনার জন্য অন্যত্র চলে যাবে।
প্রেমিক প্রেমিকার দল ঘাসের ওপর বসে বাদামভাজা খাওয়ার সুযোগ না পেয়ে চলে যাবে অপেক্ষাকৃত কম সুরক্ষিত অথচ সবজে ঘাসে ভরা কোনো সুদৃশ্য পার্কে।
এ তো হতে দ্যাওয়া চলে না। তাই সেই ঘোড়াকে সমাজচ্যুত করার জন্য উঠে পড়ে লেগেছে সকলে।
[অধ্যায়: পুরোনো রোদের টোটেম]
শুভদীপ নির্বিবাদী ছেলে। ভালো ফটোগ্রাফি করে ।সেদিন সকালে খবরের কাগজে (যে কাগজে খবরের চেয়ে বিজ্ঞাপন থাকে বেশী) ডালপুরি খেয়ে তেলতেলে হাত মুছতে মুছতে দ্যাখে বাঁদিকে একটা কোণায় একটা ছোট্ট খবর।'ঘোড়ার পেটে চাঁদের মাংস'- এই শীর্ষক একটা প্রতিবেদন। খুব মন দিয়ে পড়ে শুভদীপ। এমন একটা ঘোড়াকে সামনে থেকে দ্যাখার কৌতূহল জাগে ওর। ঠিক করে আসছে পূর্ণিমার আগে যে করেই হোক ঘোড়াটাকে খুঁজে বার করতে হবে। কিন্তু কিভাবে তা শুভদীপ বুঝে উঠতে পারেনা। তারপর থেকেই কাছে পিঠের সমস্ত ছোটো বড়ো শহরের আস্তাবলের আশেপাশে ওর যাতায়াত বেড়ে যায়। সময় ফুরিয়ে যায় দ্রুত। অথচ ঘোড়াটার দ্যাখা নেই।
তাহলে কি খবরটা ফেক ছিলো! ভাবে শুভদীপ। বাঁ দিকের কলামে আজকাল আর আস্থা রাখা যায়না।
তবু শুভদীপের খোঁজ চলতে থাকে। এদিকে অগ্নিভর সেই যে পেন চুরি গ্যাছে তার কোনো কিনারা হয়নি।
থানাপুলিশ করেও লাভের লাভ কিছু হয়নি। বরং থানা থেকে একটা পেন চুরির অভিযোগ লেখাতে আসার জন্য খিল্লির মুখে পড়ে অগ্নিভ। অগত্যা তাকে লেখা বন্ধ রাখতে হয়। যদিও পৃথিবীর কোনো গল্পই আসলে ফুরোয় না কোনোদিন। তাই সেটা গড়াতে থাকে সেই চাঁদের মাংস খাওয়া আশ্চর্য ঘোড়ার স্ফীত পেটের ভেতর।
শুভদীপ যখন ঘোড়াটাকে দ্যাখে তখন সবেমাত্র চাঁদটা ফুটে উঠেছে আকাশে। যেন এই গল্পের খাতিরে তাকে ফুটে উঠতেই হতো। শুভদীপের এই চর্বিতচর্ব্যণ মোটেও ভালো লাগে না। ফাঁপা বেঢপ দৃশ্যের স্মৃতি তার ঘোড়ার প্রতি অসম্ভব মুগ্ধতার ঘোরকে সামান্য হলেও ফিকে করে দ্যায়। তবু কৌতূহল এক অদ্ভুত অসুখ, চিকিৎসাহীন। শুভদীপ সেই অসুখে আক্রান্ত হয়। ওর হাতের ক্যামেরা হাতেই থেকে যায়। এমন অলীক জ্যোৎস্না হয়তো জীবনে কখনও দ্যাখেনি ও। পলকহীন চেয়ে থেকে ও দ্যাখে ইতিমধ্যেই ঘোড়াটা আস্তে আস্তে চাঁদের নরম গ্রীবায় দাঁত বসিয়ে তুলে নিয়েছে খানিকটা পেলব অথচ উষ্ণ নয় শীতল মাংস। ঘোড়ার মুখের কষ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে থকথকে জ্যোৎস্না।
শুভদীপ ভুলে যায় কি করে অবাক হতে হয়।
শুভদীপ ভুলে যায় কি করে শব্দহীন হতে হয়।
শুভদীপ ভুলে যায় ক্যামেরার ভাষা আসলেই
স্মৃতির ভাষা। ঘোড়াটা বেশ খানিকটা চাঁদের মাংস খেয়ে মুখ তুলে তাকায় শুভদীপের দিকে। শুভদীপ চমকে ওঠে। অনেকদিন যেন ও চমকায়নি। কী করে যে চমকাতে হয় সেটাই ওর অভ্যাস থেকে মুছে গ্যাছে। তবু চমকে ওঠে ও। আর দ্যাখে ঘোড়টার দেহটা ঘোড়ার মতো হলেও মুখটা ঘোড়ার মতো নয়। বরং সেখানে ঘোড়ার মুখের বদলে ফুটে ওঠে একজন মানুষের মুখ। যে আজ পর্যন্ত একটাও গল্প লেখেনি।
[অধ্যায়: কিংবদন্তি আলোর উদ্ভিদ]
অগ্নিভর সাথে শুভদীপের কখনও দ্যাখা হয়নি।
শুভদীপের সাথে আমারও দ্যাখা হয়নি কোনোদিন।
আমার সাথে অগ্নিভর দ্যাখা হয়নি অথচ আমি সেই লেখাটার আখ্যান ভেতর ঢুকে খুঁজতে চেষ্টা করছি সেই লেখাটা যা লিখতে লিখতে পেন নামিয়ে রেখেছিলো অগ্নিভ। তারপর তা চুরি যায় । যেটা উদরস্থ করে একটা আশ্চর্য ঘোড়া। যার স্ফীত পেটের ভেতর চাঁদের মাংস আর পেনটা মাখামাখি হয়ে গ্যাছে কবেই। আমি সেসব হন্যে হয়ে খুঁজতে থাকি আর খুঁজতেই থাকি। পূর্ণিমা পেরিয়ে অমাবস্যা আসে আবার পূর্ণিমা আসে। আকাশে সুস্বাদু চাঁদ ওঠে। ডুবে যায়। আবার পুনরায় ভেসে ওঠে। আকাশ তো নয় যেন একটা অলৌকিক পুকুর। টের পাই ঘোড়াটাও উদগ্রীব হয়ে ওঠে ভেতর ভেতর। কারণ পৃথিবীতে এখনও ঢের গল্প লেখা বাকি আছে।
অথচ সমস্ত আত্মহত্যাকামী নটেগাছকে সামনে রেখেই প্রতি মূহুর্তে পৃথিবীর সমস্ত অবিনাশ বাবুরা ঘোষণা করে চলেছেন—
আমার কথাটি ফুরালো
নটে গাছটি মুড়ালো...!