শেয়াল কেমন আছে?
রৌনিক রায়
জায়গাটা ঠিক চিনতে পেরেছে বিমল, এখান থেকে কাছেই তাদের বস্তিটা ছিল, কিন্তু এখন সেখানে বস্তিও প্রায় ফাঁকা, তেমন লোক কেউ আর থাকে না, কেন কে জানে?
আজ কাজের সুত্রে এত বছর পর আবার এখানে ফিরে এসে সেই জায়গাটা চিনতে পেরেছে সে। এখানেই উঠতে চলা সেই নতুন আবাসনের কাজে নেমে পড়তে হবে তাকেই(দুনিয়াটা সত্যিই গোল – ঘুরেফিরে আবার সেই একই জায়গায় আসতে হয়) – সেই কারনেই আজ আবার ভাগ্যের সুত্রে এত বছর পর এখানে আসা। সেখান থেকে তাদের ছোটবেলার সেই বস্তি চোখে পড়ে।
অনেক ছোট সে তখন, তখন এখানে - এখন যেখানে বিশাল বড় এক আবাসন উঠতে চলেছে - এখানেই শেয়াল থাকত।
কিন্তু সে জানে না – আবাসন বানানোর জন্য সেখানে জঙ্গল পরিষ্কার করতে বেশ কিছু লোককে লাগানো হয় – আদিবাসী সব মূলত – তারা তখন ঐ শেয়ালগুলোকে ধরে শিকার করে খায় – আর সেই জঙ্গলে ঢাকা জায়গাটাকেও আস্তে আস্তে পুরো পরিষ্কার করে দেয়। এখন সেখানে শুধু সেইসব শেয়ালদের প্রেতরা ঘোরে।
যখন সে ছোট, তখন এখনকার অনেক কিছুই ছিল না - এখনকার অত্যাধুনিক স্মার্টফোনও ছিল না, তখন কী-প্যাডের ফোন সবে বাজারে এসেছে, এতশত উত্তেজিত লিঙ্গের ন্যায় যত্রতত্র দাঁড়িয়ে পড়া সব বহুতল আকাশচুম্বি স্কাই স্ক্র্যাপার হোটেল মাল্টিস্টোরি এইসবও ছিল না, বিশেষ করে যেখানে সে থাকত, সেখানে আশপাশে বেশিরভাগই জঙ্গল ঘেরা জমিজমা ছিল, সেখানে শেয়ালও ছিল।
দূর বস্তি থেকে তখন এই জায়গাটা দেখত সে, মুলত ঝোপঝাড়ে ঘেরা ছিল এই জায়গা সেই সময়, শেয়ালেরা মাটিতে গর্তে থাকে, এটা তাকে তার মাই বলেছিল এক বার, বারার হাতে মায়ের খুন হওয়ার আগের কথা সেটা, তখনও মা বেঁচে।
আজ এখানে ফিরে আসার পথে এক জায়গায় ধুলোওড়া রাস্তার ধারে কয়েকটা মুরগি দেখেছিল সে; রক্তের আর মুরগির ছাটের আঁশটে পচা গন্ধের মধ্যে ঘুরঘুর করা কটা কুত্তা মুরগির যত ছাট মাংস সব খাচ্ছিল সমানে – যা তাদের দিকে দোকানের লোকেরা ছুঁড়ে ছুঁড়ে দিচ্ছিল মাঝে মধ্যে – খাঁচার মধ্যে নিজেদের নোংরা বিষ্ঠার মধ্যে মাখামাখি ঐ সব মুরগিগুলোর দিকে তাকিয়ে ওদের মতই নিজেকে মনে হয়েছিল তার – ওদের মতই থাকা নোংরার মধ্যে - অনিশ্চিত ভবিষ্যত – তবে জবাই হয়েই যাবে কখনো না কখনো তারা উভয়েই, কিন্তু কবে কখন হবে তা তারা কেউই না জানলেও জবাই যে হবে – এটা সেই নির্বোধ মুরগিগুলো না জানলেও সে নিজে জানে।
বাপ শালা মাকে খেদাত, আর বাপের এই গুণই সে এখন বড় হয়ে পেয়েছে, মাঝে মধ্যে তার নিজেরও মনে হয়, তার বাপই বোধ হয় তার মধ্যে ভর করেছে, যদিও বাপ এখনও বেঁচে আছে কি না তা জানে না সে, বোধহয় মরেই গেছে, গিয়ে থাকলেই ভালো, যখন বাড়ি ছেঁড়ে নিজের মামার বাড়ি চলে গেল সে অন্যত্র, তখন থেকে নিয়ে এখন অবধি বাপের কোনও খোঁজ সে পায়নি, বাপও আর তার খোঁজে আসেনি। তবে নিজেই সেই বাপ সে হয়ে উঠেছে।
যেদিন তার মা খুন হলো, সেদিন ভয়ে খাটের তলায় লুকিয়ে ছিল সে, আসলে সে গেছিল বাবার ঘরে বাপের জামার পকেট থেকে কিছু টাকা সরাতে, তাদের প্রাইমারি স্কুলের বাইরে যে বুড়ো মত লোকটা বরফ বিক্রি করত, তার থেকে বরফ কিনে তাকেও খাওয়াত প্রায় প্রতিদিনই তার এক বন্ধু দেবু, কিন্তু সে একটা রোড রোলারের নীচে পিষে গিয়ে মারা যাবার পর থেকে তার আর কোনও বন্ধু তাকে বরফ খাওয়াত না - সেরম প্রিয় বন্ধু তার আর কেউ ছিলও না তেমন – সে নিজেও অনেকটা একাচোরা হয়েই থাকত, ফলে বাবার থেকে সরাসরি টাকা চাওয়ার সাহস না থাকায় সেদিন ভাবল চুরি করেই নেবে, মাকে বলে দেখবে ভেবেছিল কিন্তু মায়ের নিজের কাছে যে টাকা নেই তা জানত সে – বাপ মাকে অনেকসময় যার জন্য পেটাত। ফলে নিতে যায় সেদিন, তখন বাবা বাড়িতে ছিল না, কাছেই বাইরে কোথাও গেছিল, মা রান্নাঘর মুছছিল, সে সেই সুযোগে বাবার শোয়ার ঘরে ঢুকে বাবার ঝোলানো জামার বুক পকেট হাতরে টাকা খোঁজার চেষ্টা করছিল কারন সে বাবাকে দেখত পয়সা সব ওই জামার ঐ পকেটেই রাখতে আর সেখান থেকেই বের করতে, এমন সময় হঠাৎ বাইরে থেকে বাবার গলার আওয়াজ শুনে ভয়ে তখন খাটের তলায় লুকিয়ে পড়েছিল সে, কারন জানত বাবা তাকে সামনে পেলেই আবার পেটাবে, বাবার সামনে সে পড়লেই তাকে দিনে অন্তত একটা চর খেতেই হত - বাবার গা থেকে বেরোনো বিচ্ছিরি মদের গন্ধ তার বিকট লাগত, বিশেষ করে সেই ঘরে সে ঢুকলে পরেই বাবার হাতে মার খেত প্রতিবার ধরা পড়লেই কারন তার সেই ঘরে পা রাখাটা তার বাপ খুব একটা পছন্দ করত না – কেন তা এখনও জানে বা বোঝে না সে, ফলে সব সময় শেয়ালের গর্তের মধ্যে লুকিয়ে থাকার মতই সেও কোথাও কোনা-খামচিতে লুকিয়ে থাকত ভয়ে - শেয়ালেরাও খুব ভীতু হয় বলে শুনেছিল সে মায়ের কাছে, তাই সেদিনও অভ্যাসবশত সেখানে লুকিয়ে পড়েছিল সে কারন বাপের গলার আওয়াজে আর পায়ের শব্দে বুঝেছিল যে তার বাপটা ঐ ঘরের দিকেই আসছে - তাড়াহুড়োয় ঐ জায়গাতেই গিয়ে ঢুকল সে ফলে, আরও একটা শব্দ সে শুনতে পেয়েছিল তখন ঘরের মধ্যে - টিকটিকির ডাক, একটা টিকটিকি তাড়া করছিল আরেকটাকে - মানে ঐ মাদির পেছনে মদ্দার হ্যাংলামো আরকি - মাদিকে মদ্দা তাড়া করছে চেপে ধরবে বলে - কেন চেপে ধরতে চায় তা বোঝাই যাচ্ছে - হঠাৎ সে শুনতে পেল বাবা আর মার মধ্যে আবার সেই অকথ্য গালিগালাজ শুরু হয়ে গেল বাবা ঢোকার সাথে সাথেই। তার পর আবার শুনল সে, একটা চরের শব্দ, আর মায়ের হালকা গলায় এক বার চেঁচিয়ে ওঠা, তার পর বাকিটা সেই খাটের তলা থেকেই লুকিয়ে লুকিয়ে দেখেছিল সে - যদিও দেখার মধ্যে শুধু দেখতে পেয়েছিল দুটো পা - একটা জোরে লাথি মারল তার বাপ তার মাকে - সেটা আওয়াজে বুঝল, তাতেই সেই ঘরের ভেজানো দরজা খুলে হুমড়ি খেয়ে ঘরের মেঝেতে পড়তে গিয়ে কোনোভাবে টাল সামলে নিল তার মা, “শালী মাগী - হুট, চল তোকে দেখাচ্ছি!” দাঁতে দাঁত পিষে কটমট করে এই শব্দগুলো উচ্চারণ করেছিল সেই শুয়োরটা তার মাকে চেপে ধরে - ঠিক সেই মুহূর্তেই ঘরের দেওয়ালে সেই মদ্দা কৃকলাস চেপে ধরল সফলভাবে সেই মাদিকে - তারপর তার মাকে চেপে ধরে কাপড় সব টান মেরে ছিঁড়ে ফেলে দিল তার হারামখোর বাপ, তার মাও দাঁতে দাঁত পিষে একইভাবে “শাল্লা বোক্কাচোদা, ছাড়!” বলে তার বাপকে খামচাচ্ছিল আর হাত পা ছুঁড়ছিল, কিন্তু গায়ের জোরে মদ্দার কাছে মাদি সব সময়ই কাবু হয়, অতএব তার বাপ তার মাকে প্রায় ল্যাংটো করে দিয়ে বিছনায় ফেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ল সেই খাটে তার মায়ের উপর, বাকিটা কী হল তা কিছুই নিজের চোখে দেখতে পায়নি সে, কিন্তু শুনেছিল ঠিকই কানে, তার মাকে জাপটে ধরে তার বাপ কিছু একটা করছিলই, প্রথমে অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই খাটটা হঠাৎ কাঁপতে শুরু করে দিল ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে - একটা ছন্দে শব্দটা হচ্ছিল, কেন তা সেদিন বোঝেনি সে, এখন বোঝে – অন্তত আন্দাজ করতে পারে; তখন ঘরের দেওয়ালে সেই মদ্দা টিকটিকি বলপূর্বক সঙ্গম করছিল সেই মাদির সাথে; তার মা তখন হালকা গলায় মাঝে মধ্যে “আহ, আহ!’ বলে নীচু স্বরে আওয়াজ করছিল সেই খাটের সেই শব্দের সাথে ছন্দ মিলিয়ে - যার মধ্যে একটা বেদনার ভাব স্পষ্ট ছিল, তখনও যে মাঝে মধ্যে তার মা তার বাপকে আটকানোর চেষ্টা করছিল না তা নয় - অন্তত শব্দ শুনে তখন বাচ্চা সে তা বুঝতে পারছিল বটে - মাঝে মধ্যে মায়ের মৃদু ছটফটানির বা হাত পা ছোঁড়ার শব্দ শুনে তা সে আন্দাজ করছিল খাটের নীচ থেকে - অনেকসময় “ছাড়!” কথাটাও বলছিল নীচু গলায়, মায়ের মুখনিঃসৃত সেই আওয়াজের সাথে ছন্দ বেঁধে খাটের সেই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দ, একটা খাট - নীচে সে, আর উপরে তার বাপ আর মা আর সেই ঘরের দেওয়ালে সেই দুই টিকটিকি - ব্যস, এরাই ছিল তখন সেখানে; হঠাৎ সেই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দের মধ্যে তার মায়ের মুখ দিয়ে মৃদু “আহ!” এর বদলে এক অদ্ভূত ধরনের শব্দ বেরোতে লাগল, শুনে এমন মনে হচ্ছিল যেন তার মায়ের গলা দিয়ে শব্দ আর বেরোচ্ছে না কিন্তু তার মা সব শক্তি দিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করছে মুখ ফুটে কষ্ট করে - যেন তার মায়ের গলার মধ্যে কিছু একটা আটকে গেছে, বা আরও ভালোভাবে বলতে গেলে - কারও গলা টিপে ধরলে সে যেমন গোঙায়, তেমন শব্দ আরকি, আর সাথে তার মা মাঝে মধ্যে জোরে জোরে শ্বাস নেওয়ারও চেষ্টা করছিল কিন্তু ভেতরে হাওয়া টানতে পারছিল না এরম মনে হচ্ছিল তার মায়ের মুখের শব্দ শুনে - যেন বা তার মায়ের শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল, সাথে তার মা তখন যে আরও খুব বেশি করে হাত পাও ছুঁড়ছিল তা তার মায়ের হাতের চুড়ির আওয়াজে আর খাটের উপরে পা ঘষার শব্দে আন্দাজ করতে পারছিল সে - ছটফট করছিল আর বিছনার চাঁদর খামচাচ্ছিল তা স্পষ্ট টের পাচ্ছিল সে আওয়াজে, তার বাপের মুখ থেকেও একটা অদ্ভূত দাঁতে দাঁত পিষে বের করা শব্দ শুনতে পাচ্ছিল সে, যেন তার বাপ খুব জোরে কোথাও চাপ দেবার সময় সেরম শব্দ করছে - মোদ্দা কথা হল, তার বাপ যে তার মাকে কষ্ট দিচ্ছে তা তো স্পষ্ট বুঝতে পারছিলই সে আর সেই ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দটাও তখন আর সেই আগের একই ছন্দে হচ্ছিল না, বেশ কিছুক্ষণ পর হঠাৎ মায়ের সেই গোঙানির আওয়াজ কমতে কমতে পুরো থেমে যায়, হাত পা ছোঁড়ার আওয়াজ, চুড়ির শব্দও - শুধু তার বাপ একভাবে তখনও মুখ দিয়ে সেই আওয়াজ করে যাচ্ছিল আর খুব জোরে জোরে শ্বাস নিচ্ছিল – হাঁপাচ্ছিল যেন, আর খাটের সেই আওয়াজ তো ছিলই - তখনো তা চলছিল এবং মায়ের সেই গোঙানির আওয়াজ থেমে যাওয়ার পর সেই ক্যাঁচক্যাঁচ আওয়াজ আবার আগের সেই ছন্দে শুরু হয় কিছুক্ষণ থেমে থাকার পর, কিছুক্ষন পর আবার সেটাও থামে আর তার সাথে সাথে আরেকটা নীচু শব্দ সে পেয়েছিল - চামড়ায় চামড়া জোরে তাড়াতাড়ি ঘষা লাগলে পরে যেরম আওয়াজ হয় সেরম একটা শব্দ - যেন হাত দিয়ে চামড়ার উপর ঘষার শব্দ; কয়েকবার হওয়ার পর সেটাও থেমে গেল, আর সাথে সাথে তার বাপ একটা আরামের দীর্ঘনিঃশ্বাস ছাড়ল বলেও মনে হল তার শুনে, তার পর তার বাপ শান্ত হল - খাটও তাতে শান্ত হল, এবং তার পর ধপ করে একটা আওয়াজ হল যেন কেউ শুয়ে পড়ল সশব্দে খাটের উপর এক ধারে - আর সাথে জোরে জোরে একটা শ্বাস ফেলার শব্দ। সে তখনও ভয় পেয়ে আরও বেশ কিছুক্ষণ খাটের নীচেই শুয়ে থাকল শেয়ালের মত - উঠতে সাহস পাচ্ছিল না, বেশ কিছুক্ষণ পর আস্তে আস্তে করে সে অনেক সাহস করে উঠে দাঁড়াল - প্রথমে আস্তে করে মাথা বের করে সাবধানে দেখল উঁকি মেরে যে বাবা অন্যদিকে পাশ ফিরে শুয়ে আছে আর পাশে মা চোখ আদ্ধেক বুজে অর্ধ নগ্ন হয়ে শুয়ে, ফলে তখন বাবা অন্যদিকে ফিরে শুয়ে থাকায় আর মাও চোখ বুজে থাকায় একটু নিশ্চিন্ত হয়ে সাহস নিয়ে আস্তে আস্তে করে উঠে দাঁড়িয়ে সে দেখল - তার মায়ের ঊর্ধ্বাঙ্গ তার সামনেই পুরো খোলা, যখন সে একেবারে ছোট মানে কোলের শিশু ছিল তখন এই বুকই তার সবচেয়ে প্রিয় বস্তু আর আশ্রয়স্থল ছিল, আর তার মায়ের মাইগুলো ছিল তার সর্বাধিক প্রিয় খাবার আর তার সবচেয়ে প্রিয় খেলার জিনিস, আর সেই মুহূর্তে খাটের নীচ থেকে বেরিয়ে উঠে দাঁড়িয়ে সেই ঘর্মাক্ত বুককে আবার দেখল সে, সেটা স্থির, কাঁপছেও না একটুও - শ্বাস প্রশ্বাসের ওঠানামা নেই, মায়ের দেহ চিত, হাত দুটো দুদিকে ছড়ানো, চোখ দুটো আধবোজা - শুধু সাদা অংশটুকু বেরিয়ে, মুখটা হালকা করে ফাঁক হয়ে, মায়ের গলার দুদিকে লালচে কয়েকটা ছোট ছোট ডিম্বাকার ছোপ ছোপ দাগ আর গলার মাঝে এই কান থেকে ঐ কানের দিকে এপাশ থেকে ওপাশ অবধি একটা লাল লম্বা দাগ গলার চওড়াটুকু জুড়ে বসে গেছে, মায়ের দুপায়ের মাঝখানের জায়গা থেকে অনেকটা পেচ্ছাপ বেরিয়ে বিছনার কিছু অংশও ভিজিয়ে দিয়েছে - কেন, তা তখন অবধারিতভাবে বোঝেনি সে - তখন তো সে জানত না যে অনেকসময় দম বন্ধ হয়ে গেলে পরে লোকে কষ্টে যন্ত্রণায় পায়খানা পেচ্ছাপ অবধি করে ফেলে - জীবনে অনেক পরে এটা সে শুনেছিল নিজের বন্ধুদের কাছ থেকে, আর সাথে মায়ের বুকের উপর আরও একটা জিনিস দেখেছিল সে - একটা থকথকে চটচটে সাদা বস্তু ছিল সেটা তার মায়ের সুন্দর নিটল দুই স্তনের মাঝখানে - অনেক পরে নিজের বখাটে হারামি বন্ধুদের কাছ থেকে সে এটাও জেনেছিল যে সেটাকে কাঁচা ভাষায় বা যাকে বলে ‘ছোটলোকদের ভাষা’ বা “ইতরদের ভাষা” বা তার নিজের যে কথ্য ভাষা, সেই ভাষায় ‘মাল’, ‘ফ্যাদা’ আরও অনেক কিছুই বলে, প্রত্যেক ছেলের শরীরেই একটা বয়সের পর তা নাকি তৈরী হয়, সে নিজেও একটা বয়সে গিয়ে তা চাক্ষুষ প্রত্যক্ষ করে দেখেছিল নিজের শরীর থেকেই; অনেকটা শুকিয়েও গেছিল সেটা তার মায়ের বুকে, তখন সে বুঝতে পারেনি সেটা কী - এখন যখন সেই ঘটনা মনে করে, তখন বুঝতে পারে এবং বেশ ঘেন্নাও লাগে আর অস্বস্তিও হয় তার এখন তা মনে করলে; যাই হোক, সেই মুহূর্তে সেই সাদা বস্তুটি কী তা জানতে কৌতূহলী হয়ে ভীত সন্ত্রস্ত হাতে কাঁপা কাঁপা আঙুলে কিছুটা তুলে নিল সে সাবধানে যাতে করে মা জেগে না যায়, তার তখনও ধারণা ছিল বদ্ধমূল যে মা হয়ত পরে নিশ্চয় জাগবে, স্রেফ বাপের অত্যাচারে ক্লান্ত হয়ে ঘুমোচ্ছে বা চোখ বুজে এমনি শুয়ে আছে - আর জেগে তখন তাকে দেখলে পরে সেটা বেশ অপ্রস্তুত একটা ব্যাপার হবে তার কাছে এটাও জানত সে – ফলে তখন সে শ্বাসও নিচ্ছিল খুব আস্তে যাতে করে সেই আওয়াজেও তার মায়ের বা বাপের কারোর কাছে সে ধরা না পড়ে, সেই চটচটে জিনিসটা হাতে আঙুলে তুলে নিয়ে সে ইতস্তত করতে করতে নাকের কাছে নিয়ে প্রথমে সাবধানে হালকা প্রশ্বাসে শুঁকে দেখল - কেমন অদ্ভূত একটা গন্ধ ছিল তাতে - তার পরও সেটা কী তা না বোঝায় সেটা জিভে আলতো করে ছুঁইয়ে একটু চেখেও দেখল - স্বাদটাও অদ্ভূত ছিল কেমন যেন, বলে বোঝানো সম্ভব নয় – একটা কেমন যেন অদ্ভূত গন্ধ ছিল তাতে, হাত ঝেড়ে সেটাকে ফেলতে গেল কিন্তু পরে ভাবল হাত ঝাড়ার শব্দে বাপ আবার পাশ ফিরে তাকে দেখে ফেলতে পারে বা মা জেগে যেতে পারে - তাহলেই হয়ে গেছে সালা; তার বাপ তখন অন্যদিকে ফিরে কাত হয়ে শুয়ে হাঁপাচ্ছিল, দম নিচ্ছিল, সে ফলে হাতটা খুব আস্তে করে নিজের গায়ের গেঞ্জির মধ্যেই মোছে। তার বাপ তখনো উল্টো পাশ ফিরে শুয়েই ছিল, কিন্তু তার মনে মনে ভয়ও ছিল, যে বাপ যে কোনো মুহূর্তে পাশ ফিরতে পারে বা মা উঠে পড়তে পারে ফলে বেশিক্ষণ এখানে দাঁড়ানোটা ঠিক হবে না, তাই পা টিপে টিপে সাবধানে যাতে আওয়াজ না হয় সেই সতর্কতা নিয়ে সেই ঘরের হাট করে খুলে থাকা দরজার ফাঁক দিয়ে সে সাবধানে গলে বেরিয়ে গেল - প্রতি পদক্ষেপে তখন তার মনে হচ্ছিল এই তার বাপ বা তার মা উঠল বলে, তবে বেরিয়ে গিয়ে একটা ভালো সিদ্ধান্তই নিয়েছিল সে সেটা তখন, কারন তখন সে সেই বাড়ি ছেঁড়ে বাইরে বেরিয়ে না গেলে তার বাপ, পরে বিছনা থেকে উঠে তাকেও খুঁজে গলা টিপে মারত একইভাবে - আর তার পর গায়ে আগুন দিয়ে নিজেকে। সেই হত্যাকাণ্ডের একমাত্র চাক্ষুষ সাক্ষী বলতে গেলে পরে সেই ঘরের দেওয়ালে এক জায়গায় সঙ্গমে রত সেই দুই টিকটিকিই ছিল - পরে ধরা পড়ে তার বাপ যথারীতি, সে সেদিন ভয়ে আর বাড়ি যায়নি, পাশে নিজের বউয়ের লাশের গায়ে উঠে থুতু ফেলে তার বাপ তাকে বিছনা ছেঁড়ে বাড়িতে এখানে সেখানে খুঁজে না পেয়ে একা একাই গায়ে আগুন দিতে যাচ্ছিল, বাচ্চা সে তখন পালিয়ে বস্তিরই একজনের বাড়িতে গেছিল কাঁদতে কাঁদতে সাহায্যের জন্য। তার বাপ গায়ে আগুন দেয়ও, ইংরেজিতে ডাক্তারি পরিভাষায় “থার্ড ডিগ্রি বার্ন” কাকে বলে জানো? যখন আগুনে চামড়ার তিনটে স্তরই পুড়ে যায়, স্নায়ু সব নষ্ট হয়ে যায়, ব্যাথা শেষের দিকে তেমন হয় না কারন স্নায়ু সব পুড়ে গেলে পরে আর ব্যাথা বা প্রদাহের সেই অনুভূতি থাকে না, তবে তার মানে এও নয় যে ব্যাথা বা জ্বালা একেবারেই হয় না। শিগগিরি হাসপাতালে নিয়ে যেতে হয় এসব ক্ষেত্রে, গায়ে আগুন দেওয়ার পর তার বাপের চিৎকারে সবাই আসে, তাও তাকে যে বস্তির বাকি লোকেরা চিৎকারে দৌড়ে এসে বাঁচিয়ে নিয়েছিল আগুন সময় মত নিভিয়ে এই ঢের, তখন প্রথমবার মানুষের পোড়া মাংসের, চামড়ার গন্ধ কেমন হয় শুঁকতে আর কেমন লাগে দেখতে আগুনে ঝলসে যাবার পর তা প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় দেখেছিল আর শুঁকেছিল সে – চামড়া পোড়া গন্ধ কেমন লাগে নাকে তা বুঝেছিল, তার পর সেখান থেকে ব্যান্ডেজের নাগপাশে বন্দি হয়ে এক মমি হয়ে থাকে তার বাপ হাসপাতালে বেশ কিছুদিন, তার পর সেখান থেকে সোজা জেল। সেই ছোট্ট বাচ্চা, তখন তার উপর দিয়ে থানা পুলিশ থেকে শুরু করে নিয়ে অনেক বড় ঝড় বয়ে যায়। আর অবশেষে তার বাপ যায় জেলে।
সেই ঘটনার পরে এক মা মরা ছেলে হয়ে সেখান থেকে সে চলে যায় মামার বাড়ি, সেখানে আবার এক নতুন জীবন শুরু হয় তার, আস্তে আস্তে সেই মানসিক আঘাত থেকে সেরে উঠতে থাকে সে, অন্তত চেষ্টা করে মনে মনে - মামার বাড়ির আদর ভালই পেয়েছিল সে, তার দিদা, মামা আর মামি, এই তিনজন নিয়ে তখন একটা নতুন সংসার হল তার, তারা প্রত্যেকেই তাকে ভালবাসত অবশ্যই, বিশেষ করে তার সেই মামা তো নিজের সেই হতভাগা ভাগ্নে শালাকে একটু অতিরিক্তই ভালবাসত। প্রায়ই সুযোগ পেলেই জড়িয়ে ধরে আদর - একা ঘরে আদর, রাতবিরেতে সময়ে অসময়ে আদর, তার শরীরটা তার মামার নাকি তুলোর মত নরম লাগত এটা তার মামা তাকে এক বার বলেওছিল, তার যদিও অনেকসময় অস্বস্তি হত, কিন্তু মামা তাকে এত ভালবাসত যে আদর করেই ছাড়বে - এতও ভালবাসতে পারে কেউ কাউকে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না এবং এরুপ ভালবাসায় যে কারও চোখে নিঃসন্দেহে জল আসতে বাধ্য, তার নিজেরও অনেক সময় চোখে জল এসে যেত এতে - এত ভালোবাসা পেয়ে, কিন্তু আবার আদরের ঠেলায় অনেক সময় দম বন্ধও লাগত তার, বিশেষ করে আদর যখন একটা বাধ্যতামূলক নিয়মে পরিণত হয় - ফলে ওখানে মামার বাড়িতেও অনেক সময় শেয়ালের মতই লুকিয়ে লুকিয়ে থাকতে হত তাকে মামার কাছ থেকে কোনও গর্তে বা কোনা-খামচিতে - হঠাৎ করে তার মামার আগে কখনো না দেখা ঐ রুপ তাকে একটু অস্বস্তিই দিত সত্যি বলতে, ওরম একটা পরিবেশেই বড় হয়ে উঠছিল সে, যা হয় আরকি - পরিবার গরীব, বেশি দূর পড়াশোনাও করেনি - খরচ ওরা টানতে পারেনি আর না তো তার নিজেরও তেমন ইচ্ছে ছিল পড়াশোনা করে বিশাল বড় কিছু একটা ছিঁড়বে, ফলে একটু শক্তপোক্ত হতেই মুটে মজুরগিরিতে নেমে পড়ে, আর বিয়ের বয়স হওয়ার সাথে সাথেই বিয়ে হয়ে যায়, এবং বিয়ে করার সাথে সাথে সে সিদ্ধান্ত নেয় যে অন্যত্র গিয়ে থাকবে, কাজের খোঁজে বউকে নিয়ে সেই বাড়ির সবাই থেকে বিদায় আর আশীর্বাদ নিয়ে অন্য বড় শহরে পাড়ি জমায় সে ফলে, মামার রাক্ষুসে আদরের হাত থেকে চিরতরে রেহাই পায় তখন, আর সাথে সেও অনেকটা ধীরে ধীরে নিজের বাপের মতই হয়ে যায় সময়ের সাথে - মানে একটা বউ খেদানো হারামজাদা বর। করে এখন মুটে মজুরগিরি।
যখন সেখানে সেই বস্তিতে সে ছোটবেলায় থাকত বাবা আর মায়ের সাথে, তখনও সেখানে এত বহুতলের রমরমা হয়নি, সেই মফস্বল শহরে প্রায় বেশিরভাগ জংলাই ছিল - যেমনটা শুরুতেই বলা হয়েছে, তবে এখন এই নগরায়ণের যুগে সব জায়গাতেই জমি সব দখল করে শুয়োরের মত দেখতে এক শ্রেণীর লোকেরা সমানে টাকা কামাচ্ছেই, আর শেয়ালেরা সব হারিয়ে যাচ্ছে – দুঃখের ব্যাপার এটাই; তার বস্তির সেই ঘর থেকে দূরে এখন যেখানে সেই বহুতল উঠতে চলেছে, সেখানে একেবারে যে জংলা জায়গা ছিল এক কালে, সেখান থেকে রাত গভীর হলেই শেয়ালের ডাক শুনতে পেত সে, তার মা তাকে কাছে শুইয়ে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে বলত যে শেয়াল ডাকছে, মায়ের কথা এখন মাঝে মধ্যে মনে পড়ে বটে, তবে মায়ের উপর মায়া হলেও ছোটবেলা থেকে একটা রাগ তার নিজের মায়ের প্রতি এখনো রয়ে গেছে - তাকে এই দুনিয়ায় জন্ম দেবার জন্য রাগ।
তার বাড়ি থেকে দূরে একটা শেয়ালকে এক বার দেখেওছিল সে ছোটবেলায়, শেয়ালটার মুখে একটা মরা কুকুরের বাচ্চা ছিল যা সে অত ভালো করে বোঝেনি দূর থেকে, কোত্থেকে তুলে এনেছিল সেটাকে ভগবান জানে, সেটাকে নিজের ডেরায় নিয়ে যাচ্ছিল খাবে বলে, তখন ছিল বিকেল, শেয়ালটাও এক মুহূর্ত থেমে গিয়ে দূর থেকে তাদের বস্তি আর বাড়ির দিকেই তাকিয়ে ছিল কিছুক্ষণ - তাকে দূর থেকে দেখেছিল কি না সেই শেয়ালটা তার ঘরের জানলার আড়ালে বসে বাইরে তাকিয়ে থাকতে কে জানে, তার কিছুক্ষণ পর আবার সেই শেয়াল সেখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজের ডেরায় চলে যায় হনহন করে।
মায়ের খুনের পর যেখানে সে চলে গেছিল মানে দূরে নিজের মামার বাড়িতে সেখানে কোনো শেয়াল ছিল না, মামার বাড়ি থেকে বেরিয়েও যেসব জায়গায় সে থেকেছে সেখানেও কোথাও শেয়াল দেখেনি সে, আর আজ এত বছর পর এখানে কাজের সূত্রে এসে আবার নিজের পুরোনো জায়গা চিনতে পারল সে, বস্তিতে নিজের সেই বাড়িটাকে এক বার দেখবে ভেবেছিল কিন্তু পরে ভাবল পুরোনো বেদনাদায়ক সব স্মৃতি আবার করে ঘেটে আর লাভ নেই।
সেখানে যেখানে আগে জঙ্গল ছিল, সেখানে এখন তা আর নেই, আর সবচেয়ে বড় কথা যার জন্য তার খারাপ লাগছে তা হল- এখন শেয়ালও আর নেই।
হয়ত নানা বড় বা ছোট শহরে যেখানে উর্বরা নরম জমির কোমল মাংসের উপর কংক্রিটের দানবেরা এখনও সেভাবে নিজেদের পাথুরে থাবা বসায়নি তাদের উদ্ধত কংক্রিটের বিশালাকার সব শিশ্ন নিয়ে সেই নরম মাটি ফুঁড়ে দিয়ে ভেদ করে এফোঁড়ওফোঁড় করে - যেখানে এখনও আধুনিক নগর সভ্যতার জান্তব আগ্রাসন পা রাখেনি তেমনভাবে - যেখানে ভূমির কুমারীত্ব এখনও অক্ষত আছে, সেই সব স্থানে এখনও অনেক জায়গায় কিছু শেয়াল বেঁচে থাকলেও থাকতে পারে। পরিশেষে এটাই বলা যায় - যদি ভগবান বলে কেউ সত্যি থেকে থাকে, তবে সে সেই সব শেয়ালদের রক্ষা করুক।