সম্পাদকের প্রতি সহ-সম্পাদক
সায়ক রায়
[বিতরণে ব্যর্থ: ঠিকানা পাওয়া যায়নি]
মাননীয়,
আপনি ও আপনার পত্রিকা এবং পাঠকের সুসাস্থ্য কামনা করেই লিখছি – এই সংখ্যার পরে আমার কোনোভাবেই এই জগতের সাথে যুক্ত থাকা সম্ভব নয়। বিগত কিছু মাসে, বিভিন্ন মতবিরোধের শিকার যেরকম আমি হয়েছি, ঠিক একই ভাবে, সমমানসিকতার আরও কিছুজন আছে, যারা আপনাকে জানাতে ইতস্তত বোধ করেন। তাদের দলে, আমি থেকেও যেন নেই, তাই নির্দ্বিধায় লিখে চলেছি –
মন্তব্যে আসি:
● পুনর্মুদ্রণের মতন ছোটলোকামি আর কিছু হয় না। আপনাদের যুক্তি অনুযায়ী, এ নাকি লেখকের পুনর্জন্ম। এদিকে আমাদের প্রজন্মের জন্মান্তর ঘটে চলেছে, তবুও বিশ শতক থেকে আর বলিষ্ঠকারীরা বেরিয়ে আসতে পারলেন না। সেটা কেবল আপনি না, অনেকেই; তফাৎ এটাই যে বাকিরা আপনার মতন সংস্কৃতির বেটন নিয়ে এদিক-ওদিক দৌড়াচ্ছে না, অথবা তাদের কোমর ভেঙে দেওয়ার মতন বাস্তব অন্য দৌড়ে নাম লিখিয়েছে। অর্থাৎ, বাসুদেব দাসগুপ্ত প্রবন্ধ ১ ও ২ বাতিল করে দিতে অনুরোধ করবো। তাতে সূচিপত্রের কিছু পাত্রী কমবে। বাকি সব ঠিকই থাকবে।
● ধারাবাহিক শেষ হলেই, আর নতুন উপন্যাসের প্রয়োগ নেবেন না। আগেরটাও অপরিপক্ক ছিল, কিন্তু আপনি বিভাগীয় মায়াজালে এতটাই অন্ধ হয়ে উঠেছিলেন যে দৈনিক কাগজের সমালোচক, অপ্রেরিত ভাবে আপনার প্রেরণা হয়ে ওঠেন। তিনটে পর্ব প্রকাশিত হল। চতুর্থ পৃথিবীর সদস্য হওয়ার আগে, আমাদের পঞ্চমুখি পাঠক, ভোগের থালা উলটিয়ে, চলচ্চিত্রের চাদর জড়িয়ে বসবে। ছোট পত্রিকা যখন করতে এসেছিলেন, প্রমিতকরণের ফাঁদ ডিঙিয়ে, এই ত্রৈমাসিক প্রয়াস ফুটে উঠেছিল। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে ধারাবাহিকতা কেবল এক আমন্ত্রিত সীমাবদ্ধতা, যদিও গতানুগতিক চোখে সব রঙই ভালো লাগে। খসড়া দেখার সময় হয়নি, তাই দায়িত্ব সম্পন্ন ভাবে প্রকাশনার গদিতে ঠেলে দিচ্ছি। দেখে বসবেন।
● “প্রবাদপ্রতিম কিংবা মধ্যস্থতাকারী বন্ধু-বিশেষ” গল্পটি নির্বাচিত করেছি এই সংখ্যার জন্য। যদিও বা অনেক ফরাসীদের থেকে অনুপ্রাণিত, লেখার ধরণটির মধ্যে মৌলিকতার ছোঁয়া আছে।
● পাবিত্র সরকারের স্মৃতিচারণ বাণিজ্যিক কারণে রেখে দিলাম। আশা করছি এতে কেউ দ্বিমত হবেন না।
● প্রচ্ছদের জন্য আরও দুটি চিত্র জমা পড়েছে। আপনি সুবিধে মতন নির্বাচন করে নেবেন।
এখানেই লেখা শেষ করলাম। এ পাঁচ বছরে যতটুকু শিখতে পেরেছি, তার জন্য আপনার কাছে কৃতজ্ঞ। কলকাতায় এলে অবশ্যই জানাবেন এবং আমার প্রণাম নেবেন -
ইতি,
মাননীয়,
আপনার দ্রুত উত্তরের জন্যে অশেষ ধন্যবাদ। ‘দাঙ্গা’ নিয়ে সংখ্যাটি এবার পরিপূর্ণ বলা যেতে পারে। সাক্ষাৎকার ৩ ও ৫, দুটির সংস্করণ হয়ে গেছে, এবং নির্বাচিত কবিতাগুলি আপনাকে এই ইমেইলের সাথে জুড়ে দিচ্ছি। বইপাড়াতে ‘ধ্যানবিন্দু’ ছাড়াও বিদ্যাসাগর টাওয়ারের দুটো দোকান রাজি হয়েছে প্রায় সমান দামে। তারকেশ্বর ও পুরুলিয়া থেকে এখনও কোনো উত্তর আসেনি। যদি আপনার আপত্তি না থাকে, পুরুলিয়ার ইন্দ্রপ্রস্থ কলোনিতে আমার এক বন্ধুর বাড়ি। যাদবপুরে একসাথেই পড়তাম। ওকে বলে দেখতে পারি। পরবর্তী সংখ্যায় তাহলে নাটমন্দির কিংবা অন্য কোথাও চেষ্টা করে দেখবো। তারকেশ্বরে আর একটু খোঁজ নিতে হবে, কারণ আপনি যার কথা বলেছিলেন, সে এখন লিটল ম্যাগাজিন মেলাতেই মগ্ন। ‘পরে করছি, পরে করছি’ বলে আর ফোন করলো না। আমিও আর তাকে বিরক্ত করিনি।
“যতিচিহ্নের স্বরূপ” প্রবন্ধটি, ১৮০০ শব্দ অতিক্রম করে গিয়েছিল। সম্পাদিত লেখাটি আপনাকে পাঠালাম। আর একটি অসুবিধে হল, লেখাটির তথ্যসূত্রে বিন্যাসকরণের দোষ আছে। তাছাড়া লেখাটির সারমর্ম ‘বোধশব্দ’ ছুঁই ছুঁই। উদ্বোধনের দিন মৃদুল দাশগুপ্ত ও শ্যামলকান্তি দাশ আসতে পারবেন না জানিয়েছেন, তাই তাঁদের শুভেচ্ছাপত্রগুলি, একজায়গায় করে পাঠালাম। সম্ভবত একইদিনে ‘দেবভাষা’র একটি অনুষ্ঠান হবে বলে, বইপাড়ার অনেকেই বোধহয় ওখানে থাকবে। আপনার অনুমতি থাকলে, ‘প্রতিক্ষণের’ শুদ্ধব্রত দেব’কে বলে দেখতে পারি। উনি আমাদের দু-বাড়ি পরেই থাকেন, সহজে না করবেন না। শেষে বলি যে সংক্ষিপ্ত লেখক পরিচিতিগুলি থেকে আপনার দাগ দেওয়া নামগুলো বাদ দিয়ে দিয়েছি।
ইতি,
[এই বার্তাটি খসড়া হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে]
কল্যাণীয়েষু,
তোমার আগের ড্রাফ্টে যা কিছু ত্রুটি ছিল, সেগুলি আমি হলুদে দাগ দিয়ে দিয়েছি; সামনের মঙ্গলবারের মধ্যে সংশোধন করে পাঠিও। পৌষ মাসের সংখ্যার জন্যে অভিনন্দন। তুমি নিশ্চয়ই জানো যে আমাদের পত্রিকার একটি চমক হল শেষপাতাটি। সাধারণত, এটি আমরা দুজনে করি, কিন্তু তোমার প্রথম প্রয়াসে, এতটা ধকল দিতে চাইনা। সামনের সংখ্যা থেকে, তুমিও এই পাতার অংশ হয়ে যেও -
শেষ পাতার জন্য দশটি তুচ্ছ-বস্তু (নিজের মতন সাজিয়ে নিও):
১। শিবরাম চক্রবর্তী বলেছিলেন কমলকুমার মজুমদারের লেখা বাংলায় আনুবাদ করা উচিত। (শ)
২। জীবনানন্দের বিখ্যাত 'ক্যাম্প' কবিতাটি প্রকাশিত হলে সজনীকান্ত দাস একে 'অশ্লীল' বলে আক্রমণ করেন। কবিতায় ব্যবহৃত "ঘাই-হরিণী" শব্দটিকে কেন্দ্র করে তিনি জীবনানন্দের রুচি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি জীবনানন্দকে ব্যঙ্গ করে ডাকতেন 'গাবুনানন্দ' বা 'জীব-আনন্দ' বলে। সজনীকান্ত লিখেছিলেন, "ইহা কি কবিতা না পদ্যধাঁধা?" (ব)
৩। মহাত্মা গান্ধী একজন শুয়োরের বাচ্চা। – ঋত্বিক কুমার ঘটক (ব)
৪। শেষ বয়সে দেবীপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়ও মূর্তিপূজো করতেন। (শ)
৫। তারাশঙ্কর একবার ক্ষোভের সাথে বলেছিলেন যে কলকাতার আধুনিক লেখকরা (বিশেষত বুদ্ধদেব বসু) "হোটেলের সাহিত্য" লেখেন। তিনি বুঝিয়েছিলেন যে, এই লেখকরা বাস্তব জীবনের ঘাম ও রক্তের খবর রাখেন না, তাঁরা কেবল কফি হাউসে বসে বিদেশি সাহিত্যের নকল করেন। (ব)
৬। মহাশ্বেতা দেবী কালীঘাট থেকে ভালোই নোট কামাতেন। (শ)
৭। বাংলাদেশে এখন যারা জনপ্রিয় লেখক (বিশেষ করে হুমায়ুন আহমেদ), তারা আসলে লেখক নন, তারা শব্দ-শ্রমিক। তারা ফর্মা মেপে আবেগ বিক্রি করেন – হুমায়ূন আজাদ (ব)
৮। আনন্দবাজার গোষ্ঠীকে আক্রমন করে নবারুণ ভট্টাচার্য বলেছিলেন যে চারপাশে যখন মানুষ না খেতে পেয়ে মরছে, তখন এঁরা প্রেম আর নস্টালজিয়া নিয়ে মরিচঝাঁপি'র বদলে দোলপূর্ণিমা'র গল্প লিখছেন। এটা সাহিত্য নয়, এটা অপরাধ। আনন্দ পুরস্কার প্রত্যাখ্যান করার সময় তিনি বলেছিলেন, "আমি তো মরা মানুষের খুলি দিয়ে ভলিবল খেলি, আমাকে পুরস্কার দিয়ে কী হবে?" (ব)
৯। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় ও শ্যামল গঙ্গোপাধ্যায় “অন্তর্জলী যাত্রা” ছাড়া কমলকুমারের আর কিছু পড়েননি - কৌশিক সরকার (শ)
১০। কৌশিক সরকার “অন্তর্জলী যাত্রা ছাড়া”, কমলকুমারের সব পড়েছে। (ব)
[ব – বাস্তব ; শ – শোনা কথা]
মার্জিনের নীচে এই পাতাতেই ‘লেখা পাঠানোর ঠিকানা’ দিয়ে দিও ও তার সাথে উল্লেখ করে দেবে যে আগামী সংখ্যা থেকে ‘১০০’ টাকা আবেদনমূল্য রাখা হবে। যে দুটি সংখ্যা আমায় একা সম্পাদনা করতে হয়েছিল, তাতে এমন মাপের লেখা জমা পড়েছিল যে এরকম বাজারি সিদ্ধান্তে আসতে বাধ্য হলাম। মতামত জানানোর ঠিকানা দরকার নেই কারণ যা বিক্রি তার উপর মতামতের কোন প্রয়োজন দেখিনা। আশা করি প্রকাশনা জগতে তুমি দীর্ঘজীবী হবে।
সুযোগসন্ধানে,
গ্রন্থ-আলোচনা
পত্রিকার জগতে কিছু কাজ দেখা দিয়েছে, যা আপাতদৃষ্টিতে চরম পরীক্ষামূলক ও প্রশংসনীয় প্রয়াস, কিন্তু কাছ থেকে দেখলে বোঝা যায় এগুলি কেবল ছলচাতুরী ও মধ্যমেধার শোরগোল। ২০২৫ এ প্রকাশিত হল একটি দ্বিভাষিক ষাণ্মাসিক পত্রিকা ‘কল্পক্ষেত্র’ যেখানে বাংলা জগতের চেনা কিছু নাম ছাড়াও নতুন কিছু নাম ফুটে উঠেছে। তার সাথে রয়েছে আর্হেন্তিনা, আয়ারল্যান্ড, জার্মানি ও বিভিন্ন দেশের লেখকদের কাজ। প্রাথমিক ভাবে উচ্চ-প্রয়াস হলেও, সম্পাদকমন্ডলীর খাপছাড়া মনোভাব স্পষ্ট। কোনো নির্দিষ্ট বিষয়কে কেন্দ্র না করেই, যেখান থেকে হোক লেখা জুড়ে দিয়ে সংখ্যাটি ছাপিয়ে ফেলেছে। একসময় ছোট পত্রিকার করত সুবিমল মিশ্র, সমীর রায়চৌধুরীর মতো তাবড় সব ব্যক্তিদের কাঁধে। তাঁদের জায়গায়, স্থান পেয়েছে যাদবপুরের গন্ডি পেরিয়ে, পোশাকী বিদেশী বিশ্ববিদ্যালয়ের ডক্টরেট মুখী…
‘আড়াইঘর’ গল্প-পত্রিকাটির পঞ্চম সংখ্যায় কটি প্রচেষ্টাময় লেখা থাকলেও, অধিকাংশ গল্পই, তাড়াহুড়ো কিংবা না চাইতে লেখা। বিশেষত ‘সম্পাদকের প্রতি সহ-সম্পাদক’ গল্পটি, বটতলার বিনোদনপত্র হিসেবে দেখলে তার ন্যায্য পাঠক-মূল্য দেওয়া যেত। তিনটি চিঠি (অথবা ইমেইল) দিয়ে গড়া গল্পটি, কোনোরকমের ভাষার ধারাবাহিকতা না রেখে, অবান্তর রেফারেন্স দিয়ে ভরানো একটি শৈলী। রাইটার্স ব্লকে বসে জোর করে লেখা গল্পটি স্থান পায়, কেবল নব-সম্পাদক সৌমাল্য চট্টোপাধ্যায়ের সাথে লেখকের ঘনিষ্ঠতা আছে বলে। এই সূক্ষ্ম সংযোগগুলি দূর থেকে দেখা ছাড়া রঞ্জন আচার্যের মতন ধীশক্তিসম্পন্ন সম্পাদকের ধ্যানস্থ রুপে, পরের প্রজন্মের হাতে বেটনটি তুলে দেওয়া ছাড়া আর গতি নেই। আগামী তিরিশ বছরেও কোয়ালিটি লেখা আসবে কিনা…
মাননীয় সহ-সম্পাদক,
সায়ক রায়
[গল্পটি আড়াইঘর ম্যাগাজিনে প্রকাশিত]